Feeds:
পোস্ট
মন্তব্য

যখন থেকে স্পষ্ট করে প্রশ্নের উত্তর দিতে শিখলাম, লোকে বাবা কি করে প্রশ্ন করলে উত্তর দিতাম, “ব্যাংকে চাকরি করে”। কোন ফর্ম পূরণ করবার সময় পিতার পেশা লিখতাম, “চাকুরি (ব্যাংকার)”। আজ হতে উত্তরটা অন্যরকম হবে। বলব, “বাবা ব্যাংকার ছিল, রিটায়ার্ড করেছে”।

পহেলা জুন ২০০৯ এর কথা শুনে আসছি সেই অনেক বছর ধরে। এইদিন বাবা অবসরে যাবে। সময়ের স্রোতে দিনটা এল এবং চলেও গেল। সময়ের এই প্রবাহ নিয়ে ভাবতে বসলে স্তব্ধ হয়ে যাই। প্রতিটা অক্ষর টাইপ করবার সাথে সাথে সেই অক্ষরটা টাইপ করবার জন্য অপেক্ষা শেষ হয়ে যায়। একটা একটা অক্ষরের শব্দ, অনেক গুলো শব্দের বাক্য, অনেকগুলো বাক্যের অনুচ্ছেদ, অনুচ্ছেদ মিলে অধ্যায়, অনেক গুলো অধ্যায়ের সমষ্টিতে একটি জীবনী। বত্রিশ বছরের চাকরির অংশটুকু আমার বাবার জীবনের একটি অধ্যায় আর চাকরিজীবি বাবার ছেলে হিসেবে সেটা আমার জীবনেরও একটা অধ্যায়। দুজনের জীবনীর দুটি অধ্যায়েরই আজ সমাপ্তি।

জীবন নিয়ে, ভবিষ্যত নিয়ে ভাবনা চিন্তার শুরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আর দশজন ছাত্রের মতই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে খুব উজ্জীবিত ছিলাম। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ইতিহাসের অংশ ভাবতাম নিজেকে। “কি হব ভবিষ্যতে”- এটা নিয়ে বন্ধুরা কথাও বলতাম। বিশাল কিছু করব, এটাই ছিল স্বপ্ন। সেই বিশাল কিছু হওয়াটাও দূরের মনে
হত না। ভাবটা এমন যে, হাতের কাছেই আছে, হাত বাড়ালেই আমি হয়ে যাব অনেক বড়, অনেক ক্ষমতাবান। বন্ধুদের বলতাম, “নিজের বাপের মত পঁচিশ বছর ধরে নয়টা পাচটা চাকরি করতে পারব না”। কি ঢিলা লাইফ, সারা জীবনে সর্বোচ্চ ৬/৭ টা প্রমোশনই সম্ভব। একটা প্রমোশনের পরে লম্বা সময় বসে থাকা পরেরটার জন্য। আমাদের পেশা হবে বৈচিত্রময় কিছু, অনেক অনেক গতিশীল, আধুনিক। অনেকেই সায় দিত। সময়ের সাথে এক, দুই, তিন করে চার বছরের অনার্স শেষ করে ফেললাম। বাস্তবতা যখন দরজার কড়া নাড়ল, তখনই ছাত্রজীবনের অপরিপক্কতা উদ্বায়ী হয়ে গেল। বুঝে গেলাম, বাবা তার জীবনে যতটুকু উঠেছে ততটুকু হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় না। সংগ্রাম করে পেতে হয়।

পেছনের দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়ে উঠে, এতদিন ধরে অদেখা কিছু দৈনন্দিন ঘটনা। তার বত্রিশ বছরের চাকরির অন্তত ২২ টা বছর আমি দেখেছি। বাবাকে আমি কখনই নয়টার পরে অফিস পৌছতে দেখি নি। বত্রিশ বছরেরর ছুটির দিন বাদে অনান্য প্রতিটি দিন। আমার জীবনে এ যাবৎ দেখা নিজ কাজের প্রতি সবচাইতে নিষ্ঠাবান আমার বাবা। কয়েক বছর আগের একটা ঘটনা। বাবা তখন অগ্রণী ব্যাংকের ঢাকার একটি জোনের প্রধান। ব্যাংকে জুন ও ডিসেম্বর মাসে ক্লোজিং হয়। জোনের বিভিন্ন শাখায় শাখায় বাবা খোঁজ খবর নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাদেরই সামনের বিল্ডিংএ বাবারই সাবেক বস থাকত। উনি তখন অবসর প্রাপ্ত। আন্টির সাথে কথা বলতে, মা মাঝে মাঝে তাদের বাসায় যায়। একবার কোন এক জুন মাসে, রাত নয়টা বাজে বাবা তখনও অফিসে। লোকটা তুচ্ছার্থে বাবার সম্পর্কে বলছিল, “আপনার জামাই ব্যাংকরে বাপ-দাদার সম্পত্তি মনে করে। তাই মনে করে আগলিয়ে রাখে। আরে ক্লোজিংএ ব্রাঞ্চের ম্যানেজাররা কাজ করবে, জোনাল হেডের অহেতুক খোজ খবরের জন্য দৌড়া দৌড়ির কী মানে হয়”। সেই ব্যক্তি তুচ্ছার্থে বললেও, আমি আমার বাবার জন্য গর্ব বোধ করি। সে সত্যিই তার কর্মস্থলকে নিজের বাপদাদার সম্পতির মতই আগলে রাখার মানসিকতা রাখে।

একবার খালার সাথে অগ্রণী ব্যাংকের এক শাখায় গিয়েছিলাম। অফিসে গিয়ে দেখি ম্যানেজার তার চেয়ারে এমন ভাবে বসে আছে যে, অন্য কেউ দেখলে ভাববে লোকটা হয় শুয়ে আছে বা ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে পিছলে যাচ্ছে। পান চিবাতে চিবাতে কথা বলছে। খালার একটা ড্রাফট নিয়ে আসবার জন্য অনেক চিল্লাচিল্লি করছে অথচ ব্যাংকের কর্মচারীরা তার কথার পাত্তা দিচ্ছে না। একই শাখায় বাবাও ম্যানেজার ছিল কয়েকবছর আগে। দুইজনকে মিলিয়ে দেখলাম। আমার বাবা সব সময় চেয়ারে সোজা হয়ে বসত, তার অধঃস্তন কর্মচারীরা সব সময় তটস্থ থাকত স্যারের।

সেই বাবাই কাল হতে আর সকাল নয়টার মাঝে অফিসে পৌছবে না। বাসায় ফিরে রাতের বেলা ফোনে অফিসারদের সাথে অফিসিয়াল ব্যাপারে কথা বলবে না। ঘটনাগুলো স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারছি না। বাবাকে এভাবে আমি দেখতে চাই না, দেখতে অভ্যস্ত নই। কয়েকদিন ধরেই নানা লোককে বলে যাচ্ছি, আমার জীবনটাকে এমন ভাবে চালাব যেন কখনও অবসর নিতে না হয়। জানি না, হয়ত এইদিন আমারও একদিন এসে যাবে। অনেক ভেবে চিন্তে আজ বুঝতে পারলাম, “আমি আমার বাবার মতই হতে চাই”। অবশ্য আমি আমার কাজ যথেষ্ট নিষ্ঠার সাথেই করি। গুনটা আমার নিজের না, অনেক বছর ধরে বাবাকে দেখতে দেখতেই পাওয়া।

বাবার শেষ অফিসের দিনটা নিয়ে কিছুদিন ধরেই মনে মনে প্লান করছিলাম। কিছুই করা হয়ে উঠল না। বাবার সাথে কিছু কথা বলার ইচ্ছে ছিল, বলতে পারলাম না। রাতে বাবা যখন ফিরল, মনটা ছলছল করছিল আমার। কিন্তু বাবার সামনে কিছুই প্রকাশ করতে পারলাম না। স্বাভাবিক ভাবই দেখালাম, অন্যদশটা দিনের মত। ছেলেরা বোধ হয় বাবার সামনে আবেগ প্রকাশ করতে পারে না।

তার এই অধ্যায়ের শুভ সমাপ্তিতে শুভেচ্ছা সহ বলতে চাই, “আমি তোমার মতই হতে চাই”।

বাবাকে সমাপ্তিতে শুভেচ্ছা

Advertisements

দিন কাটছে ঝামেলা ছাড়া। সকালে ঘুম থেকে উঠা, নাস্তা করে অফিস যাওয়া, কাজ কর্ম করা, ঠিক পাঁচটায় সবকিছু গুটিয়ে ঘরে ফেরা। ঘরে এসে হালকা খাওয়া দাওয়া, টিভির সামনে খানিক্ষণ বসে থাকা তারপর…… ব্লগ খুলে তাকিয়ে থাকা, এইতো!! হঠাৎ লিখতে মন চায়। নতুন ফাইল খুলে লিখে ফেলি কিছু লাইন। খানিক্ষণ পরে ভাল লাগে না বলে, লেখা গুলো মুছে ফেলা, ব্যস!!! আসলে লিখবার বিষয় আর পাচ্ছি না খুজে। একটা সময় নিজের অনেক কথা লিখতাম। এখন আর সেই ইচ্ছা নাই। অন্যদিকে ব্লগে জ্ঞান ছাড়তে আর আগ্রহ পাই না। ব্লগীয় আলোচনা-বিতর্কের প্রতিও বিতৃষ্ণা এসে গেছে। এগুলোর কোন শুরু নাই, শেষ নাই। সেই আস্তিক-নাস্তিক, আওয়ামী-বিএনপি। একটা কাজ ইদানিং করা হয়। তা হল নিজের পুরানো পোস্ট পড়া, সাথের মন্তব্য পড়া। কিছু ব্লগার আসলেই খুব বিরক্তিকর। তারা সেই ২০০৮ এ যে গায়েব হয়েছে আর খবর নাই। এমনকি মন্তব্যও করে না কোথাও। ভাবতে অবাক লাগে, এভাবে গায়েব কিভাবে হতে পারে ব্লগার ব্লগ হতে। আমিতো যাই যাই করে কত বারই নাটক করলাম, কিন্তু লাভ হল কী? যেতে আর পারলাম কই।

ঘোরাঘুরি তেমন একটা হয় না। বন্ধুবান্ধব সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। অফিস থেকে ফিরে আর আড্ডাবাজির আগ্রহ কারোরই থাকে না। আগে গান শুনতাম। আমি শুধু রবীন্দ্রসংগীতই শুনতাম। এখন আর তাও ভাল লাগে না। কথাবিহীন নানা ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিক ডাউনলোড করে চালিয়ে রাখি। কারন, নিস্তব্ধতায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। শুনি না শুনি, আগে গান বাজতে থাকত, এখন থাকে মিউজিক। এখন ডায়েরিতে লিখবার কিছুই থাকে না।

কলেজের সময়টার মত। কলেজে যাওয়া, ক্লাস করা প্রাইভেট পড়া বাসায় ফিরে পড়তে বসা। বোরিং!!!! তবে, জীবনের অধিকাংশ সময়টাই এমন।
একটা গান দিলাম। ঘুরে ফিরে সেই রবীন্দ্রসংগীতই। নিজের ভাবনার সাথে মিলিয়ে গান খুজতে গেলে রবীন্দ্রসংগীত খোজাটাই ভাল। সহজেই কিছু না কিছু মিলে যায়।

এমনি করে যায় যদি দিন যাক না
মন উড়েছে উড়ুক নারে
মেলে দিয়ে গানের পাখনা।

আজকে আমার প্রাণ ফোয়ারার সুর ছুটেছে
দেহের বাধ টুটেছে
মাথার পরে খুলে গেছে
আকাশের ঐ সুনীল ঢাকনা।।

ধরণি আজ মেলেছে তার হৃদয় খানি
সে যেন রে কাহার বানি
কঠিন মাটি মনকে আজি দেয় না বাধা
সে কোন সুরের সাধা।।

বিশ্ব বলে মনের কথা
কাজ পড়ে আজ থাকে থাক না।।

~মেলে দিলেম গানের পাখনা~

যেই নিরানব্বইয়ে যখন কলেজের ঢুকলাম ইচ্ছে হল ডায়রী লিখবার। এর আগ পর্যন্ত ডায়েরিতে শুধু ক্লাসের পড়ার ইতিহাস লিখতাম। যখন সত্যিকারের ডায়েরি লিখতে বসলাম সেটা ছিলি একটা এপয়েন্টমেন্ট ডায়রি। সেখানেই ছোট ছোট করে প্রতিদিনের কাজ গুলো লিখতাম ঘরে ফিরে। দিনের পর দিন প্রায় একই লেখা, “আজ সকালে অমুক স্যারের কাছ থেকে পড়ে নাস্তা করে কলেজে ঢুকলাম। ক্লাস না করেই বাসায় ফেরা এবং বিকেলে আবার প্রাইভেট পড়তে বেরিয়ে যাওয়া”। এমনি ছিল আমার দিনলিপি। চলতে চলতে পৌছলাম একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে। শুরু হল চিঠি লেখা। অনেক অনেক চিঠি লিখতাম। সেগুলো আসলে ছিল আমার অন্যরকম দিনলিপি। প্রতিদিনের নানা ঘটনাই লিখে যেতাম। যে সময়টুকু একাকী কাটত সেই সময়টুকুই লিখে রাখতাম। যেন পরে পড়তে গিয়ে আমার সেই একা মুহুর্তের সঙ্গী হয়ে যায় সে। মাঝে বাধ সাধল মোবাইল। কিছু বলার এলেই কল করা লিখবার ফুরসত কোথায়। অনেকদিন লিখলাম না। চিঠি চাইলেও বিরক্ত হতাম। বিজ্ঞানের যুগে মনে হত অবৈজ্ঞানিক আচরণ।

প্রথম পর্যায়ে বাধ ভাঙ্গা প্রেমের প্রকাশ, দ্বিতীয় পর্যায়ে বৈজ্ঞানিক যুক্তি, তৃতীয় পর্যায়কে কেমন যেন নিরস করে দিল। সব থেকেও যেন কি ছিল না। ফলে আগমন চতুর্থ পর্যায়ের, যা অসহ্য কষ্টে ভরা। একের কষ্টের কথা শুনবার সময় অন্যের কোথায়। তাই আবার ফিরে এল চিঠি। ফুরসত পেলে পড়ে নিও, কোন চাপ নেই। এই চিঠিও এক দিনলিপিই। তবে অনেকটা পরিনত মানসিকতার চিহ্ন সহ। কিছু ছিল প্রথম থেকেই যার জন্য কাহিনী প্রথম, দ্বিতীয় তৃতীয় পেরিয়ে চতুর্থ পর্যন্ত গড়াবার সুযোগ পেয়েছিল। সেটাই কাহিনীকে নিয়ে গেল পঞ্চম পর্যায়ে। পঞ্চম পর্যায় হল মসৃন, ভাল লেগে পথচলার রাস্তা। যার আছে সুনির্দিষ্ট গন্তব্য, ষষ্ট থেকে সপ্তম পর্যায়ে উন্নিত হবার। এতক্ষণ ছিল দুটি মন একটি পথ আর এখন দুটি মন দুটি পথ। চেষ্টা শুধু পথ দুটিকে সমান্তরাল রাখবার। যেন দুরত্ব সৃষ্টি না হয় কখনও।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুর দিকে এক বড় ভাই বলেছিল, জীবন হচ্ছে নদীর মত আর আমরা তাতে নৌকা বইছি। চলার পথে কিছু কচুরিপানা খানিক্ষণ নৌকাকে সঙ্গদেয় তারপর পিছিয়ে পড়ে। জীবনের নানা পর্যায়ে পাওয়া বন্ধুরাই সেই কচুরিপানা। এদের মাঝের দুই একজনকে আমরা ভালবেসে নৌকায় তুলে নেই, তারাই আসল বন্ধু। বাকিরা হয় ছাত্রজীবনের সহপাঠী, সতীর্থ অথবা কর্মজীবনের সহকর্মী।

ডায়েরির পাতার সেই সহচারী চরিত্রগুলো কবে যে সহপাঠী থেকে সহকর্মী হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। যখন বুঝলাম দুজনের এক পথচলার ইতিতে পৌছেছি মন খারাপ হয়েছিল, তবে সময়ের দাবীতে আলাদা পথকে সমান্তরাল করে নিতেও সময় লাগে নি। শুরু হল নতুন পথে চলা, সাথে সাথে নিজের অজান্তেই ডায়েরির পাতা গুলোর ধরন পালটে গেল। একটা সময়ের অভিযোগের লাইন গুলো এখন দৃঢ় বাস্তবতা। সেগুলো কেন ঘটে প্রশ্নের উত্তর এখন, “এইটাই সিস্টেম”। টিপাই মুখের বাঁধ বা ধেয়ে আসা সোয়াইন ফ্লুর জন্য কোন অবকাশ নেই। নিজের স্বার্থেই খোজ নিতে হয় অর্থনৈতিক মন্দা কতদূর। খেয়াল করলাম, অনেকদিন ধরেই কোন ব্যাপারে উত্তেজিত হই না। স্বার্থ ছাড়া অন্য বিষয় নিয়ে খুব কমই ভাবি। নিজেকে কেমন যেন চালাক চালাক মনে হয়।
জীবনের বাস্তব দৌড়ে একদিন দেখি, একবন্ধু ফেসবুকের স্টাটাস লিখল, “What is the meaning of life?”। বিদেশে পড়তে গিয়ে প্রতিদিন নতুন নতুন কি শিখল তার আপডেট লিখত সে। এর মাঝে হঠাৎ এইসব ভাববাদী কথা বার্তা বন্ধুতালিকার সদস্যরা তামাশা হিসেবেই নিল। দুইদিন পরে বন্ধু ডিজুস স্টাইলে উত্তর দেয়, “আরে মাম্মা! একটু ডিসটার্ব ছিলাম”।

একটা সময় জীবনটাকে দেখতাম বাসে মানুষের ঠেলাঠেলিতে, রিক্সা ওয়ালার রিক্সা টেনে নেওয়াতে। এখন দৃষ্টি পালটে গেছে। পালটে ফেলতে হল বলব না, নিজের জ্ঞাতসারেই পালটে গেছে। জীবনকে এখন ততটুকুই দেখা হয়, যতটুকু মানুষ দেখায়। এর গভীরে ঢুকবার আর আগ্রহ নেই। পালটে গেছি আমি, পালটে গেছে আমার সাথীরা। সবার সাথে পালটে গেছে আমার ডায়েরির পাতা। পড়লে মনে হয়, এটা এখন আসলে প্লানিং খাতা। এক অন্যরকম দিনলিপি।

~ অন্যরকম দিনলিপি ~

ব্লগ কথন

আজ কোন বিশেষ দিন নয় এমন কি নয় আমার ব্লগিয় কোন আলাদা দিন। আজ হয়নি আমার শততম পোস্ট, বর্ষপূর্তি বা লক্ষ হিট। তবুও আজ ব্লগ ইতিহাস নিয়ে লিখতে মন চাইছে। বছর দেড়েক হতে চলল এই ব্লগ আমার দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্দ অংশ। কত ব্লগার এল কত ব্লগার গেল, কত জন আজও থিতু হয়ে রইল এই সাইটে। এক কি দেড় বছর পুরোনো ব্লগাররাই আগের ব্লগ বলতে নস্টালজিয়ায় ফিরে যায়। ক্যালেন্ডারের পাতার সাথেই ব্লগে এক একটি জেনারেশন ইতি নেয়, নিজের অজান্তে স্থান দিয়ে যায় নতুন দের।

সব কিছুর মাঝেই অনেকের প্রতি জেগে উঠে মায়া, বন্ধুত্ব আবার ঘৃণা। ব্লগিয় প্রেম জেগে উঠবার অবশ্য সুযোগ আমার হয় নাই। এক সময় ব্লগে খুব আড্ডা চলত। বিশেষ করে শামিম, মুনিয়া, আউলা এদের ব্লগে। শামীমের রাত বিরাতের আড্ডা এখন আর তেমন হয় না। মুনিয়া, আউলা আমার মতই গায়েব। সাজি আপু, নিবেদিতা, চিটি আপুদের একটার পর একটা কবিতা আসত আর হজমও করতাম। নিবেদিতা আপুর অবশ্য অনেক দিন পর পর কবিতা ছাড়তেন। তাগাদা দিলেই একটা কবিতা বের হত। অন্য দিকে সাজি আপুর কবিতার সাজি আমার কাছে বরাবরই আশ্চর্যময়। এত এত কবিতা একজন মাত্র কবি কিভাবে লেখে!! চিটি আপুর প্রতিবাদ মুখর কবিতা গুলো অন্যদের থেকে পৃথক। তাদের সবার সহজবোধ্য কবিতা গুলো মিস করি প্রায়ই।

একটা সময় চিকন মিয়ার ক্রেজ সব সীমা অতিক্রম করে গেল। তারপর শুরু হল চিকন মিয়া ঘেরা পোস্ট এখন অবশ্য খোদ চিকনমিয়া এবং তাকে কেন্দ্র করে দেওয়া পোস্টের হার অনেক কমে গেছে। হয়ত চিকন মিয়ার প্রতিনিয়ত মোটা হওয়াই এর পেছনের কারন। একবার শত পোস্টে প্রায় সাত আটশত ব্লগারেরে নাম দিয়েছিলাম। এত ব্লগারের ভিড়ে ব্লগার রোবটের নামটা হারিয়ে যায়। রেগে রোবট ভাই/বোন আলাদা পোস্ট দিয়েছিল। সেই থেকে তার নামটা আমি কখনই ভুলি না।

এখন বলি নিজের কথা। একটা সময় এই ব্লগ খুব উত্তেজনায় পরিপূর্ণ রইত। বিষয়ের অভাব হত না কখনই। অনেক পোস্টে কতই না যুক্তি পালটা যুক্তির খেলা খেলেছি। আমি অবশ্য আস্তিক-নাস্তিক, বিবর্তনবাদ এই বিষয় গুলো নিয়ে মাতামাতি বেশি করতাম। কোথাও আমার চিন্তার বিপরীত কিছু দেখলেই যুক্তি খন্ডনের জন্য নেমে পড়তাম। মাঝে মাঝে আসতাম রাজনীতির আলোচনায়। সবক্ষেত্রেই একই প্রতিযোগিতা, একই উত্তেজনা। দিনের বেলা বাইরে গেলেও মাথায় ঘুরত ব্লগ। যুক্তি পালটা যুক্তি, প্রশ্ন পালটা প্রশ্নের খেলার মজার এক জগত।

ভাবতে অবাক লাগে, এখন এসব বিষয়ে প্রথম পাতা ভরা অথচ এগুলোর নিয়ে মাতামাতি করার কোন আগ্রহ আমার নাই। অনেকে আজও এসব নিয়ে ঝগড়া বিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের ধৈর্য দেখে আমি হতবাক হই বারে বারে। আমি বরাবরই সিরিয়াস মুডে ব্লগিং করে এসেছি। ব্লগের নানা বিষয় আমি সিরিয়াসলি নিতাম। চানাচুর একদিন বলেছিল, ব্লগিংকে সিরিয়াসলি নেবার কি আছে। আমরা নানা প্রান্ত হতে এই ব্লগে মিলিত হয়েছি, একদিন বিদায় নেব। একটা ওয়েবসাইটকে সিরিয়াসলি নেবার কিছু নাই। তখন বলেছিলাম আমি ভিন্ন মত প্রকাশ করি। এখন আমার মন অবশ্য পরিবর্তন হয়েছে।

মন্তব্যে ঝগড়া ঝাটি আর ভাল লাগে না। লিখতে বড্ড ইচ্ছা করে, অথচ লিখতে বসতে ক্লান্ত লাগে। ব্লগ পড়ি নিয়মিত। প্রতিদিনের এমন কোন পোস্টই হয়ত থাকে না যা আমি দেখি নি। কিন্তু মন্তব্য করতে বড় আলসে লাগে। লিখতে খুবই ইচ্ছা করে, সেই পিপাসা মিটাই গানের পোস্ট দিয়ে। আমি গানের কলি গ্রুপ খুলেছিলাম। এর সদস্য সংখ্যা ১০০ হবার পরে পোস্ট দেবার ইচ্ছা ছিল। আলসেমীতে আর দেওয়া হল না। এইতো কয়েক মাস আগে চারিদিকে আইডিয়া খুজতাম ব্লগে লিখবার জন্য। অথচ, এখন আর তা করা হয় না।

ব্লগের শুরু থেকেই দেখছি ব্লগাররা আড্ডা দেয়, যোগাযোগ করে। এই ব্যাপারটায় আমি কখনই আগ্রহ পাই নি। এইবার বইমেলায় প্রথম কোন ব্লগার মিলন মেলায় যোগ দেই। কারন একটাই, সেটা ছিল সাজি আপুর ব্লগিয় বইয়ের মোড়ক উম্মোচন। ব্লগার সাজিতে সেই দিন নিজেকে অন্যরকম লাগছিল।

যারা আমার ব্লগিংএর প্রথম দিকের সাথি তারা হয়ত মনে করতে পারবেন আমার প্রথম পোস্ট গুলোর কথা। সব মন মরা পোস্ট থাকত। কানা বাবা মন্তব্য করত আমার পোস্টে ঢুকবার আগেই জানে মন খারাপ হয়ে যাবে। তবে মন খারাপের সেই দিনগুলোতে ব্লগ আমাকে ভাল সময় কাটাতে দিয়েছে। প্রতিটি মানুষের গঠনের ক্রিয়াকালাপ যেমন এক তাদের মন খারাপের ধরণ গুলোও বোধ হয় এক। দেখা যেত, আমি যা নিয়ে মন খারাপ করে কিছু লিখতে চেষ্টা করছি, অন্য কেউ তাই লিখে ফেলেছেন ইতিমধ্যে। তখনকার দিনগুলোতে ব্লগই ছিল আমার ডায়রী। নিজের সব কিছুই লিখতাম। মন খারাপের গান লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। এখন ব্লগে আর মন খারাপের কথা লিখে মানুষকে বিরক্ত করি না।

আর কি বলব………………… স্টক শেষ। আল্লাহ হাফেজ।

ব্লগ কথন

মনপুরার ছবিটা রিলিজ হবার আগে থেকেই এর গান নিয়ে মাতামাতি হয়ে গেল। গানগুলো মাতামাতির মতই, যথেষ্ট ভাল, বিশেষ করে বাবুর গানগুলো। দেখব দেখব করে দেখা হয়ে উঠল না, আবার দুইবার হলে গিয়েই দেখে এলাম। অভিজ্ঞতাও দুই রকম। মামা ঝালকাঠী হতে ঢাকা এসে বললেন, চল মনপুরা দেখে আসি। গেলাম দুইজন মধুমিতায় গিয়ে দেখি মনপুরা সেখানে চলছে না, মনপুরা চলছে হাটখোলার অভিসার সিনেমা হলে। বসুন্ধরা সিটি দূর হয়ে যায়, তাই অভিসারেই টিকেট নিলাম। সিনেমা শুরুর আগে মামি ফোন করল। মামা বলে, মহাখালি যাচ্ছি ডাক্তার দেখাব। ডাক্তারের ওখানে মোবাইল বন্ধ রাখতে হবে। ঢুকলাম মুভি দেখতে, মাঝে কেউই মোবাইল অন করলাম না। এদিকে সেইদিনই বসুন্ধরায় আগুন লাগল। আমরা আবার বাসায় বলে বের হয়েছিলাম যে সিনেমা দেখতে যাচ্ছি, কোথায় তা বলা হয় নাই। আগুনের খবরে বিচলিত আমার বাবা চারিদিকে ফোন দিয়ে অস্থির, কারন আমি আর মামা গেছি সিনেমা দেখতে। আমাদের মোবাইল বন্ধ, বাবা কল করল মামিকে। উদ্দেশ্য একটাই, সিনেমা দেখতে যাওয়া মামা-ভাগিনার খবর জানলে জানাতে। সিনেমা শেষে মামা মামিকে ফোন করল। ডাক্তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে কি বলেছে তা একে একে বলল এবং মামিও শুনল। এরপর মামির জিজ্ঞাসা, “মনপুরা কেমন দেখলা?”। মামা তো ধরা!!!

এরপর আমাদের থিসিস জমা দিলাম, শেষ হল মাস্টার্স পর্ব। এতদিন আমাদের চারণভূমির অন্তর্গত অঞ্চলে টিএসসি ছিল না। মোরাররম ভবন, কার্জন হল ঘিরেই আমাদের আসা যাওয়া। অথচ, ঢাবি পর্ব শেষ করে আমরা সবাই মিলিত হই টিএসসিতে। ফোনে অন্যকে আগে জানাতাম, আছি ভার্সিটিতে বা ডিপার্টমেন্টে। এখন ঐ এলাকায় গেলে বলি, আছি টিএসসির আশে পাশে। বন্ধুরা ঠিক করলাম ২৬ মার্চ যাব মনপুরা দেখতে। এবারের ভেন্যু “বলাকা”।

এভাবেই একই মুভি আমার হলে গিয়ে দুইবার দেখা হল। এখন আসি মুভির কথায়। মনপুরা তেমন কোন অসাধারণ মুভি বলে আমার কাছে মনে হয় নাই। তবে দুইজন বা কয়েকজন মিলে ২/৩ ঘন্টা সুন্দর কাটিয়ে আসবার জন্য যথেষ্ট। কাহিনী টিপিকাল বাংলা সিনেমা, উপন্যাস বা নাটকের চাইতে আলাদা কিছু না। গ্রামের ধনী গাজী সাহেবের পাগল ছেলে হালিম একটা খুন করে ফেলে। ছেলেকে বাঁচাতে গাজী সাহেব তার ঘরের সরলমনা কাজের ছেলে সোনাইকে বলে সেই রাতে পালিয়ে যেতে এবং কাউকে কিছু না বলতে। যদি সোনাইকে পুলিশ ধরে তবে যেন সে সত্য বলে। স্বয়ং গাজী সাহেবই তার দখলকৃত চর “মনপুরা”তে সোনাইকে কিছু গরু ছাগল সহ ছেড়ে দিয়ে আসে। অন্যদিকে গাজী পুলিশকে বলে সোনাই খুন করে পালিয়ে গেছে। সেই চরে একাকী থাকতে থাকতে একদিন হাকিম মাঝির মেয়ে পরীর সাথে সোনাইয়ের দেখা। সোনাই-পরী একে অপরের প্রেমে পড়ে যায়। অন্যদিকে গাজী সাহেবকে এক পীর বলে, রূপবতী মেয়ে দেখে ছেলেকে বিয়ে দিলে ছেলে ভাল হয়ে যাবে। নিজ সমাজের কেউ পাগলের সাথে মেয়ে বিয়ে দিতে রাজি হবে না বিধায় গাজীর চোখ পড়ে মাঝির মেয়ে পরীর প্রতি। স্বাভাবিক ভাবেই, পরীর সাথে পাগল হালিমের বিয়ে হয়ে যায় এবং সোনাই হত্যার দায়ে গ্রেফতার হয়। পরী না পারে পাগলের সাথে স্বামী-স্ত্রীর মত থাকতে না পারে সোনাইকে ভুলতে। এই অবস্থায় গাজীর স্ত্রী পরীকে জানায় শুক্রবার রাত ১২ টা ১ মিনিটে সোনাইয়ের ফাঁসি হবে। অথচ, বৃহঃস্পতিবার সকালেই সোনাইয়ের জামিন হয়, দুই দিন ছুটির কারনে সে শনিবার ছাড়া পায়। পরী শুক্রবার রাত ১২ টা ১ মিনিটে বিশ খেয়ে আত্মহত্যা করে। সোনাই ফিরে এসে দেখে পরীর লাশ। এটাই কাহিনী।

সিনেমার কাহিনীর প্রবাহ কেমন বেখাপ্পা ছিল, সংলাপও তেমন আহামরি নয়। অভিনেতা হিসেবে চঞ্চল, বাবু, মামুনুর রশীদ বরাবরের মতই তাদের স্বাভাবিক অভিনয় করেছেন। গ্রামের গানের দলের বুড়ির চরিত্রে দিলারা জামান একেবারেই ফিট হয় নাই। তার মাঝে কেমন একটা আভিজাত্য বোধ ছিল, অনেকটা অয়ময়ের জমিদারের মায়ের মতই। অথচ মনপুরার গ্রামের সেই বুড়ির থাকা উচিত ছিল অনেকটা বৈষ্ণবী বৈষ্ণবী ভাব। সোনাই চরিত্র অতিরিক্ত সরলতা ছিল, যেটা আমার আছে স্বাভাবিক মনে হয় নাই। তবে, অনেকের মতে গ্রামে এমন অতিরিক্ত সরল মানুষ দেখাই যায়।

তবে এই ছবির যেটা অসাধারণ লেগেছে তা ছিল, ক্যামেরার কাজ। প্রতিটি দৃশ্যই খুব যত্ন করে ক্যামেরা বন্ধি করা হয়েছে। আমি এই ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ নই তবে কোথাও বেখাপ্পা লাগে নি। পরিচালকের আর একটি সুন্দর কাজ ছিল নায়িকাকে তথা তার শরীরকে ফুটিয়ে তোলা। মনপুরার নায়িকা মিলিকে খাট এবং মোটাসোটা একটা মেয়েই মনে হত। অথচ, ছবিতে পরিচালক সেই মেয়েরই শরীরের ভাঁজ গুলোকে দৃষ্টিনন্দন করে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। মিলির শারিরিক সৌন্দর্য্যের এই উপস্থাপন মোটেই অশ্লীল লাগে নি। মিলির অভিনয়ও ভাল ছিল। চোখ, মুখের সমন্বয়ে ভাব ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে।

একই ছবি দুই সিনেমা হলে দেখে একটা অভিজ্ঞতা যা পেলাম তা হল, সিনেমা হলের পরিবেশ। অভিসারের একটা বিশ্রী অবস্থা ছিল। নায়িকা আসা মাত্রই অধিকাংশ দর্শকের শীশ, তালী, চিৎকার করে উঠা প্রভৃতি সিনেমা দেখার মুডটাই নষ্ট করে দেয়। বলাকায় এমনটা ছিল না। তবে মোটের উপর বসুন্ধরা সিটির সিনেপ্লেক্সে মুভি দেখবার আলাদা একটা পরিবেশ আছে। মধুমিতা খারাপ না, তবে পরিবেশের দিক দিয়ে বসুন্ধরাই বেস্ট।

শেষে মদ্দা কথা এই যে, মনপুরা দেখলাম, ভাল লাগল। সময়টুকু সুন্দর কাটল এমন ছবি আরো হওয়া উচিত। অনেকদিন কিছু লিখি না তাই হাবি-জাবি লিখলাম।

দেখলাম মনপুরা এবং……..

সকাল নয়টা একমিনিটে মেজর জেনারেল শাকিল আহমদের দরবার বসে। জেনারেল শাকিল বক্তব্য দেন। অপারেশন ডালভাতের সম্পর্কে বলেন, সব হিসাব আছে, সবাইকে জানানো হবে। এমন সময় একব্যক্তি যে ইউনিফর্ম পড়া ছিল না দরবার হলের ভেতরে প্রবেশ করে এবং জেনারেল শাকিলের কাছে পৌছে। অন্য অফিসাররা তাকে ধরে ফেলে এবং জুতার ফিতা বেঁধে বসিয়ে রাখে এক কোনে। এমন সময় অন্য আর একজন ব্যক্তি দরবার হলে প্রবেশ করে। সেই সময় দরবার হলে মোট ৪০০০ বিডিআর সেনা বসা ছিল। দ্বিতীয় ব্যক্তির প্রবেশের পরে এই ৪০০০ হাজার সেনা বের হয়ে যায় দরবার হল থেকে। এর মাঝে বিডিআর চীফ প্রধানমন্ত্রীর দফতরের কারো সাথে ফোনে কথাও বলেন। এরপরই কিছু সেনা অফিসারদের লাইন করে দাঁড় করায় এবং গুলি করে হত্যা করে। এটা ২৫ ফেব্রুয়ারির আর্মি অফিসার হত্যাকান্ড হতে বেঁচে যাওয়া আর্মি ভার্সন।

টিভি মিডিয়ায় বিডিআর সৈন্যদের মুখে শোনা ও আর্মি অফিসাররা যারা বেরিয়ে এলেন তাদের তথ্য মতে, আমরা সিভিলিয়ানরা যে ভার্সনটা জানতাম সেটা একটু অন্য রকম। দরবার হলে এক বিডিআর সেনা জেনারেল শাকিলকে প্রশ্ন করে অপারেশন ডাল ভাতের হিসেব চেয়ে। জেনারেল শাকিল এতে খুব রেগে যান এবং তার গার্ডের অস্ত্র নিয়ে সেই বিডিআর সেনাকে গুলি করে হত্যা করেন। এরপর দরবার হতে ৪০০০ বিডিআর বেরিয়ে যায়। তারপরই বাইরে থেকে ঝাকে ঝাকে অস্ত্র সহ বিডিআর প্রবেশ করে দরবার হলে এবং গুলি করে অফিসারদের হত্যা করে। এটা ২৫ ফেব্রুয়ারির বিদ্রোহের বিডিআর ভার্সন।

প্রথম প্রথম আমি এবং অনেকের কাছে এই ঘটনা, কেবল ও কেবল মাত্র বিডিআর অসোন্তোষ বলেই মনে হয়। কিন্তু ঘটনার চারদিন পর ক্ষয়ক্ষতির ধরণ ও হিসাব পর্যালোচনা করে বলতে হচ্ছে, এটা পূর্ব পরিকল্পিত। পরিকল্পনাকারীদের পুঁজি বিডিআর সৈনিকদের দীর্ঘ দিনের অসোন্তোশ। এই অসন্তোষকে কোন ক্রমেই খাটকরে দেখার অবকাশ নেই। সব আর্মি অফিসারই স্বীকার করেন বিডিআর সেনাদের অসন্তোষের যৌক্তিকতা। তবে তার প্রকাশ এতটা সহিংস হতে পারে, এটা কেউই মেনে নিতে পারেন না। যদি কোন ঘটনার বাস্তব ভিত্তি থাকে তা আমরা মানলাম কি মানলাম না তাতে কিছুই আসে যায় না।

২৫ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় আর না হলেও দরবার হলের ভেতরের সেই ৪০০০ বিডিআর সেনার স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহন অবশ্যই থাকবার কথা। কারন তারা সকলেই হল ছেড়ে বেড়িয়ে গেছিলেন এবং তারপর বাইরে থেকে আক্রমন করা হয়। এতগুলো লোক কোনক্রমেই একটি বিপদজনক মূহুর্তে একই রকম আচরণ করতে পারে না, যদি না তারা জানেন তাদের কি করতে হবে এবং কেন করতে হবে। এই চার হাজার সেনাই সেদিনের ঘটনার সব চাইতে বড় রহস্য বলে আমার মনে হয়!!

চার হাজার বিডিআর যে খবর জানে সেটা আমাদের নানা ধরণের গোয়েন্দা বাহিনী জানে না এটা বিশ্বাস করা কোন ক্রমেই সম্ভব নয়। আর গোয়েন্দা বাহিনীর জানা এমন একটি ঘটনার কোন প্রকার পূর্বাভাস ১২০ জন উচ্চপদস্থ সেনাকর্মকর্তা বা তাদের পরিচিত কোন সেনা কর্মকর্তারা জানবেন না এটা ভাবাই সম্ভব নয়। আর কিছু না হোক, এই ১২০ জন কর্মকর্তার চাকরি জীবনের কোন না কোন অধস্তন সৈনিকই কি সেই ৪০০০ এর ভেতর ছিল না যারা এদের অন্তত একজনকে শ্রদ্ধা করেন বা পছন্দ করেন? স্যারের অতীত কোন সাহায্যের কৃতজ্ঞতা স্বরুপও তাদের কারো না কারো এই আর্মি অফিসারদের সতর্ক করার কথা। কিন্তু এমন কিছুই হয় নাই। শুধু তাই নয়, পিলখানার ভেতরে ১৫০০০ জওয়ান থাকার কথা, কিন্তু ছিল চার/পাচ হাজার বা আরো কম। বাকিরা কি সবাই পালিয়ে গেছে? তাহলে কিভাবে? অবশ্যই তাদের পালাতে দেওয়া হয়েছে। পিলখানা যেভাবে ঘেরাও করা ছিল সেটার প্লানে কে ছিলেন?

আর একটা ব্যাপার হল, বেশির ভাগ আর্মি অফিসারের মৃত দেহ গনকবর দেওয়া হলেও কয়েকজনের দেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয় নর্দমায়। অনেক অনেক লোক মিলে অগ্নিসংযোগ করে নানা ভবনে, ঘরে ঘরে গিয়ে খুজে বের করে অফিসারদের। আবার, অনেককে হাসপাতালে নেওয়া হয়, স্বয়ং বিডিআর সেনারাই নাকি কয়েকজনকে রক্ত দেন। একই ঘটনার বিভিন্ন রকম অংশ!!! উপর থেকে দেখলে এই ঘটনায়, সেই দিন পিলখানার ভেতরের কয়েকটি অংশ দেখা যায়। এক অংশ জানত তাদের হত্যা করতে হবে আর্মি অফিসারদের (হয়ত তারা ভিতরে ছিল), অন্য অংশ জানত তারা আসলে বিদ্রোহ করছে (এদেরই হয়ত আমরা টিভিতে দেখেছি), আর এক অংশ হয়ত কিছুই জানত না। তবে প্রথম দুই অংশে অবশ্যই বিপুল সংখ্যাক বিডিআর সেনার সম্পৃক্ত থাকার কথা। কেউ কেউ বলছেন বিডিআর সেনাদের মাঝে এই সহিংসতার জন্য অর্থ বিতরণের কথা। বাংলাদেশের রাজধানীর অভ্যন্তরে বিডিআর সদর দপ্তরে কয়েক হাজার বিডিআর জওয়ানের মাঝে সহিংসতার জন্য অর্থ বিতরণ হচ্ছে আর সেটা সরকার যদি না জানে, তাহলে না বলে পারি না যে সেই সরকারের হাতে রাষ্ট্র আর নেই। তা ক্ষমতায় আরোহন যদি এক সপ্তাহ আগে হয় তাহলেও প্রযোজ্য।

আপাততঃ মনে হয় এই পরিকল্পনার, প্রধান অস্ত্রই হচ্ছে “রহস্যের মাধ্যমে সবাইকে নির্দিষ্ট সময় ব্যাপি বিভ্রান্ত করা, যতক্ষণে আসল অপরাধী ভোল পাল্টাবে বা নিরাপদ স্থানে পৌছবে”। ঘটনার মাঝে অনেকগুলো ফাক তৈরি যা একমাত্র “হয়ত/হতে পারে” দিয়ে পূরণ করা ছাড়া গতি নাই। যিনি বা যারা এর পরিকল্পনাকারী তারা বিপুল সংখ্যাক মানুষের আপদ কালীন মূহুর্তের মনস্তাত্তিক অবস্থা সম্পর্কে গভীর ভাবে ওয়াকিবহাল। গোয়েন্দা বাহিনীর এই ঘটনা সম্পর্কে পূর্বাভাস না দেওয়া এবং প্রায় ১০০০০ বিডিআরএর পিলখানা ছেড়ে পালানো ইঙ্গিত করে আমাদের সামরিক বেসামরিক উভয় প্রকার প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের ভয়ঙ্কর ও রহস্যপূর্ণ ঘাপলার প্রতি।

যাই হোক না কেন, এই ঘটনা যদি পূর্ব পরিকল্পিত হয় তবে বলতে হয়, দেশে ইন্টেলিজেন্স থাকা আর না থাকা একই ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ব্যাপার যদি তাৎক্ষণিক ও স্বতঃস্ফুর্ত হয় তবে বলতে হয়, আর্মির অভিজাততন্ত্র এতটাই অন্ধ হয়ে উঠেছে যে মানুষ তার মানবিকতা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। আমাদের দেশে যে কয়টি চাকরির ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য যে “একবার ঢুকতে পারলে, সারা জীবনের নিশ্চয়তা” এবং সেখানে একটি অভিজাত শ্রেনী আছে সেখানেই এমন ভাবে অভিজাত তন্ত্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এটা সামরিক/বেসামরিক আমলা বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সর্বক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

ঘটনা যেভাবেই, যেই উদ্দেশ্যেই হোক না কেন সত্য হচ্ছে আমরা সেটা কখনই জানতে পারব না। ঠিকই সামরিক আদালতে কিছু বিডিআর সেনার মৃত্যুদন্ড হবে। অনেকে হয়ত ইতিমধ্যেই তার শাস্তি পেয়ে গেছেন। ঠিক যেমনটা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার ক্ষেত্রে ঘটেছিল। ১৩ জনের ঠিকই ফাঁসি হয়, অথচ আজও কেউ জানে না আসল ঘটনা। আগামী দুই তিন বছর ২৫ ফেব্রুয়ারিতে হয়ত ব্লগে পোস্ট আসবে “এই সেই ২৫ ফেব্রুয়ারি”। ২৫-৩০ বছর পর বর্তমানে কোন কর্মকর্তা হয়ত অবসরে গিয়ে বই লিখবেন, “কি ঘটেছিল সেদিন: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯” শিরোনামের বই। আমরা ভাল করেই উপলব্ধি করতে পারি, শীঘ্রই আমরা মাতামাতির জন্য নতুন বিষয় পাব। তাতেই নেচে উঠবে ব্লগ, মিডিয়া, আমাদের দৈনন্দিন জীবন। নিহত অফিসারদের পরিবার ফিরে যাবেন তাদের স্বাভাবিক জীবনে, জীবনতো আর বসে রইবে না। যেই সব বিডিআর জওয়ানদের মৃত্যু হবে বা হয়ত ইতিমধ্যেই হয়েছে তাদের পরিবারের খবর আমরা কেউই জানব না। শুধু তাই নয়, আমাদের কোন আলোচনায় আসবে না সেই সব বিডিআরদের কথাও যারা বিদ্রোহের বিরোধীতা করে প্রান দিয়েছেন।

সরকার থেকে আমাদের কখনই জানানো হবে না কি ঘটেছিল, কেন ঘটেছিল বিধায় ঘটনা জানার চেষ্টা অর্থহীন। আমরা হয়ত হিসেব করে এই সহিংসতায় অনেকেরই স্বার্থ খুজে পাব, কিন্তু তা সবই হবে অনুমান ও নিজ নিজ আদর্শ নির্ভর। তবে আমরা একটা ব্যাপার নিশ্চিত যে, যেই বিষয়কে পুঁজি করে এত সহস্র বিডিআরকে ব্যবহার করা হয়েছে, সেটার অবশ্যই ভিত্তি আছে। অর্থাৎ, বিডিআর জওয়ানদের দাবিগুলো। এই দাবি গুলো কেন অতৃপ্ত রয়ে গেল? এর জবাব শুধু সেনা কর্মকর্তাদেরই দিতে হবে, কারন দায়িত্ব তাদের ছিল। জওয়ানদের এই ক্ষোভগুলো কেন সরকার জানত না, জবাব দিতে হবে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের। ক্ষোভ ছিল বলেই এটাকে ব্যবহার করা গেছে। যদিও আমরা এটাও জানি যে, এদেশে জবাব কেউই কাউকে দেবে না।

সকাল বিকাল প্যারেড করা সেনাবাহিনী আমাদের দরকার আছে, কারন তাদের যে কোন মূহুর্তে কাজে নামাতে হতে পারে। কিন্তু এই সেনা কর্মকর্তাদের ক্যান্টনমেন্টের বাইরে জেল খানায়, হাসপাতালে, বিদ্যুৎ, টেলিফোন, দূর্নীতি দমন, চাল-ডাল বিক্রি প্রভৃতি বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব দেওয়া বিপদজনক। এত বড় সেনাবাহিনীর চাইতে আমাদের আরো বেশি দরকার দক্ষ পুলিশ বাহিনী, শক্তিশালী নৌবাহিনী (বঙ্গোপোসাগরে সম্পদ রক্ষার্থে), দক্ষ সীমান্ত রক্ষী বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, আনসার, এবং অবশ্যই অবশ্যই দক্ষ ও বিশ্বস্ত গোয়েন্দা বাহিনী।

অবশেষে: সেনাবাহিনী একটি রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার দায়িত্বে থাকে। যেমনটি, মানবদেহের Immune System দেহের প্রতিরক্ষায় থাকে। Cells of the Immune System ই এই Immune System এর গাঠনিক অংশ। দেহ এই কোষগুলোকে তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেবার আগে যা করে সেটাকে আমরা বলি Educate করা। এক্ষেত্রে Educate করা বলতে বুঝায় এই কোষ গুলোকে self (দেহের আপন অংশ) ও Non self (বাইরে থেকে আসা যেমন ব্যাক্টেরিয়া, ভাইরাস বা অন্য কিছু) এর মাঝে পার্থক্য করা শিখিয়ে দেওয়া। অর্থাৎ Immune System শুধু মাত্র বাইরে থেকে দেহে অনুপ্রবেশকারী অচেনা বস্তুকেই নির্মুল করবে। নিজ দেহের কোষ বা অনুগুলোকে কখনই সে বাইরের বলে মনে করবে না। যদি Immune System নিজ দেহের কিছুকে আক্রমন করেতে থাকে তখন এটা একটা রোগ যার নাম Autoimmune Diseases. ফলাফল আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু বা চিরস্থায়ী অসুস্থতা।

প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোর এক একজন সদস্যকে (জওয়ান, অফিসার প্রত্যেককে) নিয়োগ দেবার পূর্বে ভাল ভাবে Educate করতে হবে জনগনকে আপন করে ভাববার জন্য। তারা যদি জনগনকে তাদের চাইতে পর বা আলাদা কিছু ভাবতে শুরু করে ফলাফল দাঁড়াবে দেশের পতন বা চিরস্থায়ী বিশৃঙ্খলা।


বিডিআর বিদ্রোহের তদন্ত রিপোর্ট

বিডিআর বিদ্রোহ করল ২৫ ফেব্রুয়ারি, আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে আমরা জানি বিদ্রোহ শেষ। প্রশ্ন থেকে যায়, যা শেষ হল তা কি নতুন কিছুর শুরু? বিদ্রোহিদের আমরা কতটুকু দেখলাম! মুন্নি সাহার সাহসী সাংবাদিকতার কল্যানে দেখলাম কিছু বিদ্রোহি সৈনিককে। নিরীহ অসহায়ের দৃষ্টি তাদের, অসংগঠিত। একজন দুঃখ করে আর্মির সৈনিকদের উদ্দেশ্য করে বলল, “ওরাও আমাদের ভাই, আমাদের কষ্ট ওরাও বোঝে”। ছেলেটা খুব সম্ভবত আদিবাসীদের কেউ হবে। কয়েকজন বলল, অফিসারদের দ্বারা তাদের প্রতি নানা নির্যাতন এমনকি হত্যার কথা। তাদের চোখে মুখে ছিল উৎকন্ঠা। মুন্নি সাহার প্রশ্ন, এত সব প্রশ্ন আজই কেন? আগে কেন এল না। তাদের অসহায় উত্তর@ মুন্নি আপা, তারা অনেক চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ডিজি সাহেব তাদের কথা সরকারের কাছে বলেন না। সেই সাথে কেউ কেউ ডিজি শাকিল আহমেদ এবং তার স্ত্রীর দুর্নীতির কথাও জানালেন। পরদিন ২৬ ফেব্রুয়ারি বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশ ব্যাপি। চ্যানেল আইতে দুই বিখ্যাত বুদ্ধিজীবি পেছনের বিশেষ শক্তি খুজে বেড়ালেন, অথচ ২৫ ফেব্রুয়ারি যে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির ফলাফল হতে পারে সেটা একবারও ভাববার দরকার বোধ করলেন না। বিডিআরের যে বিদ্রোহ তার মূল কারন “অপারেশন ডাল-ভাত”। এই অপারেশনে যে দুর্নীতি হয়েছে বিডিআর সদস্যরা সেটা নিজ চোখে দেখেছেন। দুর্নীতিবাজ অফিসারদের নির্যাতন তারা কেনই বা সহ্য করবেন? সাধারন সৈনিক তাই? এভাবে কাউকে দমিয়ে রাখা যায় না।

দক্ষিণ এশিয়ায় সেনাবাহিনীর যে ধরন তাতে, জনগনের টাকায় দুধ কলা দিয়ে সেনাবাহিনী পালা হয়। উদ্দেশ্য, জাতীয় দুর্যোগে এরা বিদেশী বা দেশী শক্তির বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে আমাদের বাঁচাবে। তাই সেই জাতীয় দুর্যোগের অপেক্ষায় তাদের জনগন থেকে আলাদা রেখে লালন পালন করা হয়, নিয়মিত শৃঙ্খলার চর্চা করানো হয়। পাকিস্তান ও ভারত দেখে যে সীমান্তে সেনাবাহিনী রাখলে তারা সাধারণ মানুষের সাথে মেলা মেশা করে। অনেকেই এতে শৃঙ্খলা বিনষ্ট হবার ভয় পান। ফলে প্যারা মিলিটারি ফোর্স গঠন করা হয় শুধু সীমান্তের জন্য (পূর্ব পাকিস্তানের ইপিআর, পরবর্তিতে বাংলাদেশের বিডিআর)। ধারনা করা হয়, এর ফলে সাধারন মানুষের সাথে উঠা বসা করা প্যারামিলিটারি মূল সেনাবাহিনীকে দুষিত করতে পারবে না। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে নবগঠিত বিডিআর এর জন্য আলাদা বিসিএস ক্যাডার করা হয়, পরীক্ষা নিয়ে তাদের প্রশিক্ষণও শুরু হয় (যেটা বর্তমানে বিডিআরের দাবী)। কিন্তু অজানা কারনে সেই পরিকল্পনা বাদ দিয়ে মূল সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সেখানে ডেপুটেশনে দায়িত্ব দেওয়া শুরু হয়। ১৯৭২ সালের শেষ দিকে একটি বিডিআর বিদ্রোহ ঘটে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সৈনিকদের মাঝে স্ব-শরীরে উপস্থিত হয়ে তাদের শান্ত হতে আহ্ববান জানান। বঙ্গবন্ধুর সরাসরি আবেদন সৈনিকরা ফেলতে না পেরে শান্ত হয়। আমাদের দুর্ভাগ্য দেশে এখন সেই রকম সাহসী নেতা আর নেই।

পাকিস্তানে বা ভারতে সেনাবাহিনীর আলাদা গুরুত্ব আছে। আমাদের দেশে সেনাবাহিনী প্রতিকি, থাকতে হয় তাই আছে। আমার বুদ্ধি হবার পরে এদের প্রথম ব্যবহার দেখি ১৯৯৬ এ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। খুব সম্ভবত যাত্রাবাড়িতে যানজট নিরসনে। এরপর সেনাবাহিনীর নানা ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে দেখি পরবর্তি বিএনপি সরকারের সময়। আর ২০০৭ এর ১/১১ এর সময় থেকে সেনাবাহিনী ক্ষমতাই পরিচালনা শুরু করে পরোক্ষ ভাবে। শুরু হয় সাধারণ মানুষের সাথে তাদের মেলামেশা। এতে সমস্যা কোথায়? বুঝতে হালকা ইতিহাসের পাঠ নিতে হবে।

১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙ্গে যাবার পরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো যুদ্ধে পরাজয়ের কারন জানতে বিচারপতি হামদুর রহমানের নেতৃত্বের একটি কমিশন করেন। উল্লেখ্য, বিচারপতি হামদুর রহমান একজন বাঙালি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য। উনি পাকিস্তানের পক্ষেই থাকেন এবং পাকিস্তানেই রয়ে যান। যুদ্ধ ফেরত পরাজিত সৈন্য, অফিসার, জেনারেলদের বক্তব্য তিনি শুনে কমিশনের রিপোর্ট দেন।
তার রিপোর্টে বলা হয়, “১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করেন যা পরবর্তি প্রায় ১০ বছর বলবৎ ছিল। এই দশ বছরে সেনা কর্মকর্তারা বিভিন্ন প্রদেশে, বিভাগে, বেসামরিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। যার যার ক্ষেত্রে সীমাহীন ক্ষমতার চর্চা করতে গিয়ে এক সময় তাদের মাঝে অর্থ-সম্পদ, জমি, মদ, নারী প্রভৃতির আসক্তি সৃষ্টি হয়। ফলশ্রুতিতে সৈনিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটে। ১৯৭১ এর যুদ্ধে তাদের বলা হয়েছিল রসদের টান পড়লে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগন হতে তা সংগ্রহ করতে। তবে সেনাবাহিনীর আইন মতে, তার তালিকা রাখতে হবে এবং নির্ধারিত নীতিমালা মেনে চলতে হবে। সমগ্র পূর্ব বাংলা নিজেদের হাতে খোলা পেয়ে, আগের মূল্যবোধ হারানো সামরিক অফিসাররা উম্মাদ হয়ে উঠেন। যত্রতত্র লুটপাট, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন চালাতে থাকেন। ফলশ্রুতিতে সমগ্র বাঙালি জাতি সেনাবাহিনীকে প্রতিপক্ষ গন্য করে এবং নিজ দেশে সেনাবাহিনী বিদেশী হয়ে পড়ে”। অবশেষে বিচারপতি সুপারিশ করেন, “ভবিষ্যতে সেনাবাহিনীকে যেন অবশ্যই বেসামরিক প্রশাসন হতে দূরে রাখা হয়”।

বাংলাদেশে জানুয়ারি ২০০৭ থেকে ডিসেম্বর ২০০৯ পর্যন্ত একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসন নিয়ন্ত্রন করে। রাজনীতিবিদ এবং তাদের সহযোগীদের বিপুল দুর্নীতি লব্ধ সম্পদ তাদের হস্তগত হয়। বিডিআর সৈনিকদের দাবী মতে “অপারেশন ডাল-ভাত”-এ ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। এদিকে বিগত রাজনৈতিক সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির কাহিনী প্রচারিত হওয়ায় সাধারন জনগন (মধ্যবিত্ত, কৃষক, শ্রমিক, সৈনিক সহ সবাই) দুর্নীতিবাজদের প্রতি এক প্রকার নাখোশ। তারপর সেই দুর্নীতির বিরুদ্ধের যুদ্ধের পরিচালক সেনা কর্মকর্তারা নিজেরাই যখন দুর্নীতি করলেন, তার উপর আবার অধঃস্তনদের নির্যাতনও করলেন, সৈনিকরা আর চুপ করে থাকতে পারল না। তাদের অনেক দিনের সব জমানো ক্ষোভ একত্রিত হয়ে সুনামির মত জেগে উঠল। সমূদ্রতলে অনেক বছর ধরে জমে যাওয়া শক্তি যখন প্লেটোনিক প্লেটের অবস্থান পালটে দেয় তখনই সুনামি উঠে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জমে থাকা বাঙালি সৈনিকের সম্মিলিত শক্তি ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ এ জেগে উঠল। প্রস্ফুটিত হল, অতিতের সব বাঞ্ছনার ইতিহাস।

এটাই কি সেই পিছনের অদৃশ্য শক্তি নয়? তবে কেন অহেতুক বাইরের বা ভিতরের অন্য শক্তি খোজা?

(………….. চলবে )

প্রসঙ্গ: বিডিআর বিদ্রোহ এবং পেছনের অদৃশ্য শক্তি-১