Feeds:
পোস্ট
মন্তব্য

Archive for অক্টোবর, 2009

টিপাইমুখ গড়িয়ে অনেক পানি সুরমা কুশিয়ারা হয়ে মেঘনায় গড়াল। তবে এই বোধ হয় ইতি। প্রথমে স্রোতে পড়বে টান, তারপর পানির পরিমানে তারপর শুধু ধুঁ ধুঁ বালুচর। একেবারেই হারিয়ে যাবে অনিন্দ সুন্দর প্রকৃতি, নদী কেন্দ্রিক বাংলা হয়ে যাবে স্মৃতি। ভাবতে কষ্ট হয়, নদী বিহীন এই বিশ্বের বুকে কোন বাংলার অস্তিত্ব!

আজপর্যন্ত যা বুঝলাম, তার সারমর্ম হল টিপাই মুখে একটি বাঁধ বা কারো কারো ভাষায় ড্যাম হতে চলছে। এটা হবেই, আমরা যাই বলি না কেন। আমাদের জাতির মহান নেতা শেখ মুজিব। তিনি ভারতের ফারাক্কা বাঁধ নির্মানে সম্মতি দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রতি শেখ মুজিবের দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলার ক্ষমতা আমার নেই, তাই ধরে নিচ্ছি ভারতের প্রতি সরল বিশ্বাসেই তিনি ফারাক্কায় বাধ নির্মানে সম্মত হন। এই সম্মতির ফলাফল যে ভয়ংকর হবে তা সেদিন মাওলানা ভাসানী বুঝতে পেরেছিলেন বলেই হয়েছিল তার ঐতিহাসিক লংমার্চ। তিনিও এ জাতির এক মহান নেতা। শেখ মুজিবের ভুল বিশ্বাস, মাওলানা ভাসানীর ব্যর্থ প্রচেষ্টা সর্বোপরি আমাদের অসাড়তার ফলাফল আজ গড়াই নদী ইতিহাসের পাতায়, পদ্মার বুকে বালুচর।

সেদিন শেখ মুজিবের সামনে বাঁধের ভয়াবহতার এবং ভারতের চুক্তিভঙ্গের কোন উদাহরণ ছিল না। অথচ, আজ সংসদের তিন চতুর্থাংশ আসন জয় করে ক্ষমতায় অসীন বঙ্গবন্ধু কন্যার কাছে পিতার আমলের ভুল সিদ্ধান্তের উদাহরণ আছে। অথচ, তিনি, তার দেশপ্রেমিক মন্ত্রী, এমপি (কেউ কেউ বীর মুক্তিযোদ্ধা) তারা কেউই ফারাক্কা বাঁধের ভয়াবহতাকে আমলে নিচ্ছেন না। চোখের সামনে মরা পদ্মা রেখে যারা আজ টিপাই মুখ সমর্থন করে গলাবাজি করছেন তাদের উদ্দেশ্য সৎ বলে ধরে নিতে ব্যর্থ হলাম। সরকারই যখন দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে বদ্ধপরকর তখন আম জনতা আর কি করতে পারে। হায়! এখন ভাসানীর ন্যায় কেউ আর নেই। বিএনপি প্রতিবাদ করছে, কিন্তু সেটাতো নাকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে! মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া এই বঙ্গদেশে আমরা দেশপ্রেমিক জনগন বিএনপির ফাঁদে পা দিয়ে টিপাই মুখের বিরোধিতা করে তো আর রাজাকার সীল লাগাতে পারি না! টিপাই মুখে বাঁধ হবে বা হয়ে যাচ্ছে। বাঁধের নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করতে যাচ্ছেন দেশপ্রেমিক (!) আওয়ামী প্রতিনিধি দল। ফিরে তারা বলবেন, “চিন্তার কিছু নেই, সুন্দর বাঁধ হচ্ছে। দেশ এগিয়ে যাবে”। “দেশ” বলতে কোন দেশ বোঝাবেন তা ইতিহাস সাক্ষীদেবে।

আন্তর্জার্তিক আইন, পানি বন্টন, নদীর পানির ইউনিট কিউসেক, বাঁধ বা ড্যামের পার্থক্য এত কিছু আমি বুঝি না। শুধু বুঝি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা পড়লে, দু’তীরে হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে উঠা প্রাকৃতিক সম্পদ, জনজীবন সব বিনষ্ট হবে। বরাক নদী হতে বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়েছে সুরমা আর কুশিয়ারা, এ দুটো মিলে মেঘনা নদী। মানুষের লিখিত ইতিহাসে বাংলাকে প্রথম পরিচিত করে মেঘনা নদী। টলেমি লিখে গেছেন, সম্রাট আলেকজান্ডার সেই মেসিডোনিয়া হতে ভারত পর্যন্ত জয় করে এসে বাধা পেয়েছিলেন তৎকালীন ভারতের গঙ্গাঋধি রাজ্যে, যা বর্তমান বাংলা। সামরিক বিশেষজ্ঞরা আলেকজান্ডারকে বর্ণনা দিয়েছিলেন গঙ্গাঋধির বিশাল হস্তিবাহিনীর। মেগাস্থেনাসের ইন্ডিকাতে বর্ণনা আছে, গঙ্গাঋধির বিশাল মাঘোন (আমাদের মেঘনা) নদীর কথা। যার এক তীর হতে অন্য তীর দেখা যায় না। দু পাশে প্রচুর ধান উৎপন্ন হয়, সেই ধান হতে তৈরি মদ খাওয়ানো হয় সেনাবাহিনীর যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হাতিদের। এই হাতির ভয়ে আলেকজান্ডারের সৈন্যরা এগিয়ে যেতে অস্বীকার করলে, আলেকজান্ডার মেসিডোনিয়ার দিয়ে ফিরতি যাত্রা শুরু করেন। এসব ইতিহাসের সাক্ষি মেঘনা এবার হয়ত নিজেই ইতিহাস হবে।

পদ্মা, মেঘনা এই নদী গুলোই সব নয়। আছে এদের শাখা প্রশাখা। জালের মত বিস্তৃত এই বাংলার মানুষের সংস্কৃতি, সাহিত্য, আচার আচরণ সব কিছুরই ভিত্তি নদী। বাঙ্গালিকে নাকি শাসন করা খুব কঠিন। এরা নিজেই নিজের রাজা। ইতিহাসে কেউই বাংলাকে শান্তিতে শাসন করতে পারে নি। জালের মত এই অঞ্চলের ভুখন্ডগুলোকে নদী আলাদা করে রেখেছে। নদীর ভাঙ্গনে ভৌগলিক সীমারেখা কখনই স্থির হয়নি। বিধায় দৃঢ় কোন সামাজিক সংগঠনও আমাদের এই অঞ্চলে তেমন দেখা যায় না। শাসিত হতে আমাদের বড় ভয়। কেউ জোড় করতে এলেই আমরা বিগড়ে যাই। এবার মনে হচ্ছে বাঙ্গালি নামের পাগলা ঘোড়াকে বেঁধে ফেলা গেল। হাজার হোক ভারত বর্ষের এই জাতিটিই স্বাধীন দেশের অধিকারি।

আজ যারা ভারতের কাছে স্বেচ্ছায় মাথা নত করে টিপাই মুখ মেনে নিল তারা শুধু আগামী পাঁচ বছরের জন্যই অপরাধ করল না। তারা অপরাধ করল এই নদীর দ্বারা পুষ্ট হাজার হাজার বছর অতীতের এবং আগত ভবিষত্যের কাছে। আজ হতে হাজার বছর পর জন্ম নেওয়া বাঙ্গালিটি যখন নিঃশেষ হয়ে যাওয়া মেঘনার উপহার থেকে বঞ্চিত হবে, তার কাছে অপরাধী হবে এই বিশ্বাসঘাতকরা।

একাত্তরের রাজাকারেরা একাত্তরের অপরাধী। তাদের তৎকালীন যুদ্ধাপরাধের জন্য আমরা তাদের বিচার করার জন্য আইনের আশ্রয় নিতে পারি। কিন্তু যাদের অপরাধ কাল নিরপেক্ষ কোন আইনে তাদের বিচার করব? রাজাকারদের রাজাকার বলি কারন তারা স্বেচ্ছায় জন্মভূমির স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছিল। আজকের এই বিশ্বাসঘাতকেরা কি স্বেচ্ছায় বিশ্বাস ঘাতকতা করছে না? তবে রাজাকার গালি এদের কেন দেব না?

দীর্ঘশ্বাস ফেলে, হতাশাভরে লিখতে হচ্ছে, নিকট ভবিষ্যতে সুরমা, কুশিয়ারা, মেঘনা আর এভাবে প্রবাহিত হবে না। তার বুকে রইবে ধুঁ ধুঁ বালুচর। তবে সময়ের কাছে সাক্ষি দিয়ে যেতে চাই, “আমি এই বিশ্বাসঘাতকদের সাথি ছিলাম না। মুক্তিযুদ্ধের বিশ্বাস ঘাতকদের যেমন আমি রাজাকার বলে ঘৃণা করেছি, তেমনি বাংলার বর্তমান বিশ্বাসঘাতকরাও রাজকার ভিন্ন আমার কাছে আর কিছুই না”।


টিপাই মুখে বাঁধ: কালের কাছে এক বাঙালির স্বীকারোক্তি

Advertisements

Read Full Post »

ইদানিং বাঙ্গালি ব্লগার সংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটছে বলে মনে হয়। কত নতুন নতুন নিক/নাম। কিন্তু সেই তুলনায় ব্লগ ঢিলা হয়ে গেছে। বছর খানেক আগের ব্লগিংইয়ের সাথে মিলাতে গেলে হতাশ হই। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে একটা নতুন আপদ। আজকাল অনেকেই পোস্ট দিয়ে কমেন্ট, হিট প্রভৃতির জন্য কান্নাকাটি করে। মনে হয় তাদের ব্লগে আসবার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে বিশিষ্ট হিট ব্লগার হওয়া। বেচারা নাফিসের তাদের পোস্টে আনন্দ সহকারে তার হিট বাড়াবার পোস্টগুলোর লিংক ছেড়ে আসতে হয়।

আমি যখন এই ব্লগে আসি তখন লোভনীয় দুইটি প্যানেল ছিল। পেইজের বামদিকে শীর্ষ পোস্টদাতা ব্লগয়ার ও ডানের নিচের দিকে সর্বাধিক জনপ্রিয় পোস্ট। নিজের লিংক আলাদাভাবে সেখানে প্রদর্শনের একটা সুযোগ ছিল কিন্তু, তখনও কাউকে “আমার পোস্ট কিভাবে জনপ্রিয় হবে” জাতীয় কান্নাকাটি করতে দেখা যায় নাই। কমেন্টের প্রতি একটা লোভ সবারই থাকে, আমারও ছিল। আমি কি লিখলাম, সেটা অন্যের কাছে কেমন লাগল তা জানতে কে না চায়। তবে ব্লগে প্রধানত জনপ্রিয় হতে কেউ ব্লগিং করত কিনা সন্দেহ।

নতুন ব্লগারদের জন্য কিছু বলতে চাই। ব্লগিং এর সাথে অন্য মিডিয়ার পার্থক্য হল এখানে লেখক তার লেখাকে পাঠক দ্বারা সরাসরি যাচাইয়ের একটা সুযোগ পাচ্ছে। অনেকটা বিভিন্ন ফোরামের মত। তবে ফোরামগুলোর কিছু প্রাইম এজেন্ডা থাকে। যেমন কোথাও প্রযুক্তি, কোথাও বিজ্ঞান, কোথাও সাহিত্য, ইতিহাস বা অন্য কিছু। সেখানে অন্য বিষয়ে লেখা যেতে পারে তবে তা মূল আলোচনার বাইরের বিষয় হলে অনেকটা বেখাপ্পা লাগবে। ফোরামগুলো হতে ব্লগিং পার্থক্য হল, এখানে কোন নির্দিষ্ট এজেন্ডা নেই। যা ইচ্ছা তাই লিখতে পারেন। এটাই এখানের বৈশিষ্ট্য।

ব্লগার তার ইচ্ছে মত লিখে যাবে, পড়ে যাবে। অন্যকারো জন্য সে বসে রইবে না। কোথাও কোন বাঁধা নাই। আমার কোন লেখার সমালোচনা যে কেউ করতে স্বাধীন, কিন্তু কেউ এটা বলতে পারবে না, “এটা কেন লিখলেন, এটা লেখা নিষেধ” (যতক্ষণ না তা অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে।)। সেই হিসেবে, “আমার পোস্ট কেউ কেন পড়ে না”, “কিভাবে কি করলে অনেক লোকে পড়বে” টাইপের পোস্ট দেওয়াতেও কোন বাধা নেই। তবে আমি মনে করি শুধু হিট বাড়ানো, বা জনপ্রিয় হবার আশায় লিখলে নব্য ব্লগার ব্লগিং এর আনন্দ হতে নিজেকে বঞ্চিত করবেন। শুধু তাই নয় নতুনরা একসময় হতাশও হয়ে পড়বেন।

তাই নতুন ব্লগারদের জন্য বলতে চাই, “নিজের মনে যা আসে লিখে যান, কে পড়ল, কতজন পড়ল সেই হিসাব করা দরকার নাই”। যদি আপনার মন সুন্দর হয়, চিন্তা স্পষ্ট হয় এবং সুন্দর মন ও চিন্তাকে লিখে সুন্দর করে উপস্থাপন করবার ক্ষমতা আপনার থাকে বা আয়ত্ত্ব করতে পারেন তবেই আপনি অন্যের কাছে প্রিয় হতে পারবেন। তখন দেখবেন, আপনি ব্লগে ব্যস্ততার জন্য আসতে পারছেন না কিন্তু ব্লগাররা আপনাকে, আপনার লেখাকে মিস করছে। তখনই পোস্ট দিন যখন আপনার মন চাইছে কিছু লিখতে। পোস্ট দিতে হবে নিজেকে নজরে আনতে, এই লক্ষ্যে কখনই পোস্ট দেবেন না। এতে নিজেকে স্বাধীন ভাবে প্রকাশ করতে ব্যর্থ হবেন।

ব্লগে নিজেকে স্বাধীন করে দিন, দেখবেন এমনিতেই বাড়ছে আপনার হিট। তখন আপনিও উপভোগ করবেন বাঁধ ছাড়া স্বাধীনতা, অন্যরাও জানবে আপনার ভিতরের এতদিনের সুপ্ত প্রতিভা।

নাদান ব্লগারদের উদ্দেশ্যে

Read Full Post »

বিলেতের ইংলিশ চ্যানেল, লন্ডনের টেমস্‌ নদীর নাম সেই ছোটবেলা থেকে শুনেছি। ব্রজমোহন নামের এক ব্যক্তি সাঁতার কেটে ঐ বিলাতি চ্যানেল অতিক্রম করেছিলেন। বিশ্বের অনেক নামী দামী শহর গড়ে উঠেছে কোন না কোন নদীর তীরে। শহরবাসী তাদের সেই সব নদীগুলোকে সাজিয়ে রেখেছেন ছবির মত। সকালে তার তীর ঘেষে চলে তাদের হাটা হাটি, মন খারাপ হলে একাকী নদীর সাথে কাটানো আরো কত কি! সমুদ্র তীরে বিস্তৃত সমুদ্রের বিশালতা মানুষের মনকে নাকি প্রসারিত করে দেয়। সংকীর্ণ চিন্তা ছাপিয়ে বিশালতা জায়গা করে নেয়। অস্থির মন হয় শান্ত। সব নগরের নাগরিক এই সুযোগ পায় না। প্রশস্ত নদীই তাদের সমুদ্রের অভাব মেটায়।

নগর জীবনে বিশালতার স্থান কোথায়? মুখ তুলে কোথাও তাকালে দৃষ্টি কতটুকুই বা প্রসারিত হবার সুযোগ পায়? যে দৃষ্টি কখনও বিশালতার ছোঁয়া পায় নি, সে হয়ত বুঝবে না এর গুরুত্ব। কিন্তু, যে সমুদ্রের তীর ঘেঁষে একদিন দাঁড়িয়েছিল তার কাছে বিশালতার তৃষ্ণা থাকবে সবসময়। ২০০৮ এর শুরুতে সমুদ্রের বিশালতার ছোয়া পেয়েছিলাম সেন্টমার্টিনে। ফিরতে না ফিরতেই মন জানান দিল তার অতৃপ্তির কথা। কিন্তু হায়! আমি যে ঢাকায় থাকি। তাই বলে কি হাল ছেড়ে দেব? না! হার মানা হারের প্রতি আগ্রহ আমার নাই। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বন্ধুরা তাই বেড়িয়ে পড়তাম বিশালতায় সন্ধানে। কোথায় আর যাব, রাস্তায় হাটা হাটি। প্রতিদিন যেতাম নতুন নতুন পথে, চিনতাম নতুন নতুন রেস্তোরা, নতুন নতুন খাবার। চার দেওয়ালে ঘেরা রুমের চাইতে একদিকে প্রসস্ত রাস্তাই বা কম কিসে!!

এভাবে হাটতে হাটতে একরাতে নতুন এক পথ ধরলাম। কিছুদূর গিয়ে অন্যরকম এক জগতের সন্ধান মিলল। নদীর তীর ঘেষে লম্বা প্রশস্ত রাস্তা, পাশে বড়বড় গাছের কাঠের গুড়ি, তাকে তাকে সাজানো। তারই সামনে একটা অন্য রকম ব্রীজ। ব্রীজটা অন্যরকম এই অর্থে যে এটা নদীর এপার ওপারে না মিলিয়ে নিজেও তীর ঘেষে চলে গেছে। আমাদের ঢাকায় এরকম সময় কাঁটাবার জায়গা আছে জানা ছিল না। রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলাম, নির্জন অন্ধকার!! মাঝে মাঝে দু একটি গাড়ি দেখা যায়। একপাশ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ঢাকার বুড়িগঙ্গা, অন্য পাশে পুরোনো দিনের ঢাকার আমেজ। আজ হতে চারশ বছর আগে নদী পথে ইসলাম খান যখন ঢাকাতে আসেন ঢাকার এই এলাকাই তার চোখে প্রথম বাঁধে। তিনি সিদ্ধান্ত নেনে এখানেই মোঘল বাংলার রাজধানী স্থাপনের।

নদী, নিস্তব্ধতা, নির্মল বাতাস এই তিনের সংমিশ্রন এই শহরে পাওয়া আর আলাদিনের চেরাগ পাওয়া একই মনে হল। সব সুন্দরের সাথে আল্লাহ কিছু না কিছু অসুন্দর মিলিয়েই দেন। এখানে আছে ময়লা পানির একধরনের গন্ধ। তবে তা এতটা প্রকট না যে আমাদের দূরে সরিয়ে দেবে। সেই থেকে প্রতি সন্ধ্যায় পৌছে যাই সেখানে। ইদানিং খুব বাতাস বয়, নদীর পানিও বেড়েছে। ভাল লাগে। রাতে যাই, তাই ছবি তুলতে পারি না। পূর্ণিমার রাতে জায়গাটা অন্যরকম হয়ে যায়। নিজেকে আর ঢাকাবাসী মনে হয় না। কাঠ ব্যবসায়ীদের ফেলে রাখা বিশাল বিশাল কাঠের গুড়ির উপর নদীর এক তীরে বসা আমরা অন্য দিকে জাহাজ বানাবার ডকইয়ার্ড। ওপারের একটা ঘাটের নাম “সাগর”। এপারে বসে ওপার হতে মাঝে মাঝে আসা অক্সি এসিটিলিন শিখার আভাস পাওয়া যায়। ডান দিকে তাকালে দেখি বুড়িগঙ্গার উপরের আলুবাজার ব্রীজ বেয়ে চলে যাচ্ছে কতগুলো গাড়ি। বামে তাকালে দেখি বুড়িগঙ্গার পোস্তাগোলা ব্রীজের লাইটপোস্টগুলো। একই সাথে বুড়িগঙ্গার উপরের দুটি ব্রীজ আর একটি ব্রীজের উপর দিয়ে দেখা।

সেখানে আর একটি বিশেষ নজরকাড়া ব্যাপার আছে, সেটা হল র‌্যাব ১০ এর হেডকোয়াটার। অন্য র্যা ব অফিসগুলোর চাইতে এই হেডকোয়াটারটা আলাদা। যে জানে না তার চোখে কখনই র‌্যাবের অফিসটা আটকাবে না। সাধারন একটা বাড়ি, ফটক সবসময় বন্ধ। সামনে নেই কোন গাড়ি বা কালো র‌্যাব পাহাড়ারত। শুধু একটা সাইনবোর্ডে লেখা “র‌্যাব ১০”, নিচে একটা সিসিটিভির ক্যামেরা।

প্রথম দিকে হেটে হেটে জায়গাটার সন্ধান পেয়েছিলাম। যেদিন হাটতে ইচ্ছে করত না আমরা রিক্সা নিতাম। প্রতিদিনই রিক্সাওয়ালার সাথে ঝামেলা বাধত, কারন আমরা ঠিক করে বলতে পারতাম না কোথায় যাব। রিক্সাওয়ালার ভাব বুঝে আন্দাজের উপর ভাড়া ঠিক করতাম। কখনও ঠকতাম আমরা, কখনও বা রিক্সাওয়ালা। একদিন আমরাও চিনে গেলাম। টিকাটুলির বলধা গার্ডেনের মোড় থেকে ফরাশগঞ্জ কাঠপট্টি যাব, বললেই ১৫/২০ টাকায় পৌছে যাওয়া।

মাঝে মাঝে আমি একাকী ঘুরতে বের হই, একেবারে নিসঙ্গ। অনেকের মাঝে একা একা ঘুরতে ভাল লাগে। সেরকমই এক বিকেলে গিয়েছিলাম সেখানে, কিছু তোলা ছবি দিলাম। জায়গাটাতে স্থানীয় ছেলেপুলেরা ছাড়া অন্যরা যায় বলে মনে হত না। ইয়ুটিউবে মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীর ‘থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার’ নাম্বার মুভিতে জায়গাটার একটা দৃশ্য আছে। আমাদের রাজধানীর ভারী জীবনকে একটু হালকা করার অনেক উপকরণ এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমরা চাইলে সেগুলোকে গুছিয়ে নিতে পারি, গড়তে পারি আমাদের এক অন্যরকম ঢাকা।

অন্যরকম ঢাকা

Read Full Post »

যখন থেকে স্পষ্ট করে প্রশ্নের উত্তর দিতে শিখলাম, লোকে বাবা কি করে প্রশ্ন করলে উত্তর দিতাম, “ব্যাংকে চাকরি করে”। কোন ফর্ম পূরণ করবার সময় পিতার পেশা লিখতাম, “চাকুরি (ব্যাংকার)”। আজ হতে উত্তরটা অন্যরকম হবে। বলব, “বাবা ব্যাংকার ছিল, রিটায়ার্ড করেছে”।

পহেলা জুন ২০০৯ এর কথা শুনে আসছি সেই অনেক বছর ধরে। এইদিন বাবা অবসরে যাবে। সময়ের স্রোতে দিনটা এল এবং চলেও গেল। সময়ের এই প্রবাহ নিয়ে ভাবতে বসলে স্তব্ধ হয়ে যাই। প্রতিটা অক্ষর টাইপ করবার সাথে সাথে সেই অক্ষরটা টাইপ করবার জন্য অপেক্ষা শেষ হয়ে যায়। একটা একটা অক্ষরের শব্দ, অনেক গুলো শব্দের বাক্য, অনেকগুলো বাক্যের অনুচ্ছেদ, অনুচ্ছেদ মিলে অধ্যায়, অনেক গুলো অধ্যায়ের সমষ্টিতে একটি জীবনী। বত্রিশ বছরের চাকরির অংশটুকু আমার বাবার জীবনের একটি অধ্যায় আর চাকরিজীবি বাবার ছেলে হিসেবে সেটা আমার জীবনেরও একটা অধ্যায়। দুজনের জীবনীর দুটি অধ্যায়েরই আজ সমাপ্তি।

জীবন নিয়ে, ভবিষ্যত নিয়ে ভাবনা চিন্তার শুরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আর দশজন ছাত্রের মতই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে খুব উজ্জীবিত ছিলাম। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ইতিহাসের অংশ ভাবতাম নিজেকে। “কি হব ভবিষ্যতে”- এটা নিয়ে বন্ধুরা কথাও বলতাম। বিশাল কিছু করব, এটাই ছিল স্বপ্ন। সেই বিশাল কিছু হওয়াটাও দূরের মনে
হত না। ভাবটা এমন যে, হাতের কাছেই আছে, হাত বাড়ালেই আমি হয়ে যাব অনেক বড়, অনেক ক্ষমতাবান। বন্ধুদের বলতাম, “নিজের বাপের মত পঁচিশ বছর ধরে নয়টা পাচটা চাকরি করতে পারব না”। কি ঢিলা লাইফ, সারা জীবনে সর্বোচ্চ ৬/৭ টা প্রমোশনই সম্ভব। একটা প্রমোশনের পরে লম্বা সময় বসে থাকা পরেরটার জন্য। আমাদের পেশা হবে বৈচিত্রময় কিছু, অনেক অনেক গতিশীল, আধুনিক। অনেকেই সায় দিত। সময়ের সাথে এক, দুই, তিন করে চার বছরের অনার্স শেষ করে ফেললাম। বাস্তবতা যখন দরজার কড়া নাড়ল, তখনই ছাত্রজীবনের অপরিপক্কতা উদ্বায়ী হয়ে গেল। বুঝে গেলাম, বাবা তার জীবনে যতটুকু উঠেছে ততটুকু হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় না। সংগ্রাম করে পেতে হয়।

পেছনের দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়ে উঠে, এতদিন ধরে অদেখা কিছু দৈনন্দিন ঘটনা। তার বত্রিশ বছরের চাকরির অন্তত ২২ টা বছর আমি দেখেছি। বাবাকে আমি কখনই নয়টার পরে অফিস পৌছতে দেখি নি। বত্রিশ বছরেরর ছুটির দিন বাদে অনান্য প্রতিটি দিন। আমার জীবনে এ যাবৎ দেখা নিজ কাজের প্রতি সবচাইতে নিষ্ঠাবান আমার বাবা। কয়েক বছর আগের একটা ঘটনা। বাবা তখন অগ্রণী ব্যাংকের ঢাকার একটি জোনের প্রধান। ব্যাংকে জুন ও ডিসেম্বর মাসে ক্লোজিং হয়। জোনের বিভিন্ন শাখায় শাখায় বাবা খোঁজ খবর নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাদেরই সামনের বিল্ডিংএ বাবারই সাবেক বস থাকত। উনি তখন অবসর প্রাপ্ত। আন্টির সাথে কথা বলতে, মা মাঝে মাঝে তাদের বাসায় যায়। একবার কোন এক জুন মাসে, রাত নয়টা বাজে বাবা তখনও অফিসে। লোকটা তুচ্ছার্থে বাবার সম্পর্কে বলছিল, “আপনার জামাই ব্যাংকরে বাপ-দাদার সম্পত্তি মনে করে। তাই মনে করে আগলিয়ে রাখে। আরে ক্লোজিংএ ব্রাঞ্চের ম্যানেজাররা কাজ করবে, জোনাল হেডের অহেতুক খোজ খবরের জন্য দৌড়া দৌড়ির কী মানে হয়”। সেই ব্যক্তি তুচ্ছার্থে বললেও, আমি আমার বাবার জন্য গর্ব বোধ করি। সে সত্যিই তার কর্মস্থলকে নিজের বাপদাদার সম্পতির মতই আগলে রাখার মানসিকতা রাখে।

একবার খালার সাথে অগ্রণী ব্যাংকের এক শাখায় গিয়েছিলাম। অফিসে গিয়ে দেখি ম্যানেজার তার চেয়ারে এমন ভাবে বসে আছে যে, অন্য কেউ দেখলে ভাববে লোকটা হয় শুয়ে আছে বা ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে পিছলে যাচ্ছে। পান চিবাতে চিবাতে কথা বলছে। খালার একটা ড্রাফট নিয়ে আসবার জন্য অনেক চিল্লাচিল্লি করছে অথচ ব্যাংকের কর্মচারীরা তার কথার পাত্তা দিচ্ছে না। একই শাখায় বাবাও ম্যানেজার ছিল কয়েকবছর আগে। দুইজনকে মিলিয়ে দেখলাম। আমার বাবা সব সময় চেয়ারে সোজা হয়ে বসত, তার অধঃস্তন কর্মচারীরা সব সময় তটস্থ থাকত স্যারের।

সেই বাবাই কাল হতে আর সকাল নয়টার মাঝে অফিসে পৌছবে না। বাসায় ফিরে রাতের বেলা ফোনে অফিসারদের সাথে অফিসিয়াল ব্যাপারে কথা বলবে না। ঘটনাগুলো স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারছি না। বাবাকে এভাবে আমি দেখতে চাই না, দেখতে অভ্যস্ত নই। কয়েকদিন ধরেই নানা লোককে বলে যাচ্ছি, আমার জীবনটাকে এমন ভাবে চালাব যেন কখনও অবসর নিতে না হয়। জানি না, হয়ত এইদিন আমারও একদিন এসে যাবে। অনেক ভেবে চিন্তে আজ বুঝতে পারলাম, “আমি আমার বাবার মতই হতে চাই”। অবশ্য আমি আমার কাজ যথেষ্ট নিষ্ঠার সাথেই করি। গুনটা আমার নিজের না, অনেক বছর ধরে বাবাকে দেখতে দেখতেই পাওয়া।

বাবার শেষ অফিসের দিনটা নিয়ে কিছুদিন ধরেই মনে মনে প্লান করছিলাম। কিছুই করা হয়ে উঠল না। বাবার সাথে কিছু কথা বলার ইচ্ছে ছিল, বলতে পারলাম না। রাতে বাবা যখন ফিরল, মনটা ছলছল করছিল আমার। কিন্তু বাবার সামনে কিছুই প্রকাশ করতে পারলাম না। স্বাভাবিক ভাবই দেখালাম, অন্যদশটা দিনের মত। ছেলেরা বোধ হয় বাবার সামনে আবেগ প্রকাশ করতে পারে না।

তার এই অধ্যায়ের শুভ সমাপ্তিতে শুভেচ্ছা সহ বলতে চাই, “আমি তোমার মতই হতে চাই”।

বাবাকে সমাপ্তিতে শুভেচ্ছা

Read Full Post »

দিন কাটছে ঝামেলা ছাড়া। সকালে ঘুম থেকে উঠা, নাস্তা করে অফিস যাওয়া, কাজ কর্ম করা, ঠিক পাঁচটায় সবকিছু গুটিয়ে ঘরে ফেরা। ঘরে এসে হালকা খাওয়া দাওয়া, টিভির সামনে খানিক্ষণ বসে থাকা তারপর…… ব্লগ খুলে তাকিয়ে থাকা, এইতো!! হঠাৎ লিখতে মন চায়। নতুন ফাইল খুলে লিখে ফেলি কিছু লাইন। খানিক্ষণ পরে ভাল লাগে না বলে, লেখা গুলো মুছে ফেলা, ব্যস!!! আসলে লিখবার বিষয় আর পাচ্ছি না খুজে। একটা সময় নিজের অনেক কথা লিখতাম। এখন আর সেই ইচ্ছা নাই। অন্যদিকে ব্লগে জ্ঞান ছাড়তে আর আগ্রহ পাই না। ব্লগীয় আলোচনা-বিতর্কের প্রতিও বিতৃষ্ণা এসে গেছে। এগুলোর কোন শুরু নাই, শেষ নাই। সেই আস্তিক-নাস্তিক, আওয়ামী-বিএনপি। একটা কাজ ইদানিং করা হয়। তা হল নিজের পুরানো পোস্ট পড়া, সাথের মন্তব্য পড়া। কিছু ব্লগার আসলেই খুব বিরক্তিকর। তারা সেই ২০০৮ এ যে গায়েব হয়েছে আর খবর নাই। এমনকি মন্তব্যও করে না কোথাও। ভাবতে অবাক লাগে, এভাবে গায়েব কিভাবে হতে পারে ব্লগার ব্লগ হতে। আমিতো যাই যাই করে কত বারই নাটক করলাম, কিন্তু লাভ হল কী? যেতে আর পারলাম কই।

ঘোরাঘুরি তেমন একটা হয় না। বন্ধুবান্ধব সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। অফিস থেকে ফিরে আর আড্ডাবাজির আগ্রহ কারোরই থাকে না। আগে গান শুনতাম। আমি শুধু রবীন্দ্রসংগীতই শুনতাম। এখন আর তাও ভাল লাগে না। কথাবিহীন নানা ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিক ডাউনলোড করে চালিয়ে রাখি। কারন, নিস্তব্ধতায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। শুনি না শুনি, আগে গান বাজতে থাকত, এখন থাকে মিউজিক। এখন ডায়েরিতে লিখবার কিছুই থাকে না।

কলেজের সময়টার মত। কলেজে যাওয়া, ক্লাস করা প্রাইভেট পড়া বাসায় ফিরে পড়তে বসা। বোরিং!!!! তবে, জীবনের অধিকাংশ সময়টাই এমন।
একটা গান দিলাম। ঘুরে ফিরে সেই রবীন্দ্রসংগীতই। নিজের ভাবনার সাথে মিলিয়ে গান খুজতে গেলে রবীন্দ্রসংগীত খোজাটাই ভাল। সহজেই কিছু না কিছু মিলে যায়।

এমনি করে যায় যদি দিন যাক না
মন উড়েছে উড়ুক নারে
মেলে দিয়ে গানের পাখনা।

আজকে আমার প্রাণ ফোয়ারার সুর ছুটেছে
দেহের বাধ টুটেছে
মাথার পরে খুলে গেছে
আকাশের ঐ সুনীল ঢাকনা।।

ধরণি আজ মেলেছে তার হৃদয় খানি
সে যেন রে কাহার বানি
কঠিন মাটি মনকে আজি দেয় না বাধা
সে কোন সুরের সাধা।।

বিশ্ব বলে মনের কথা
কাজ পড়ে আজ থাকে থাক না।।

~মেলে দিলেম গানের পাখনা~

Read Full Post »

যেই নিরানব্বইয়ে যখন কলেজের ঢুকলাম ইচ্ছে হল ডায়রী লিখবার। এর আগ পর্যন্ত ডায়েরিতে শুধু ক্লাসের পড়ার ইতিহাস লিখতাম। যখন সত্যিকারের ডায়েরি লিখতে বসলাম সেটা ছিলি একটা এপয়েন্টমেন্ট ডায়রি। সেখানেই ছোট ছোট করে প্রতিদিনের কাজ গুলো লিখতাম ঘরে ফিরে। দিনের পর দিন প্রায় একই লেখা, “আজ সকালে অমুক স্যারের কাছ থেকে পড়ে নাস্তা করে কলেজে ঢুকলাম। ক্লাস না করেই বাসায় ফেরা এবং বিকেলে আবার প্রাইভেট পড়তে বেরিয়ে যাওয়া”। এমনি ছিল আমার দিনলিপি। চলতে চলতে পৌছলাম একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে। শুরু হল চিঠি লেখা। অনেক অনেক চিঠি লিখতাম। সেগুলো আসলে ছিল আমার অন্যরকম দিনলিপি। প্রতিদিনের নানা ঘটনাই লিখে যেতাম। যে সময়টুকু একাকী কাটত সেই সময়টুকুই লিখে রাখতাম। যেন পরে পড়তে গিয়ে আমার সেই একা মুহুর্তের সঙ্গী হয়ে যায় সে। মাঝে বাধ সাধল মোবাইল। কিছু বলার এলেই কল করা লিখবার ফুরসত কোথায়। অনেকদিন লিখলাম না। চিঠি চাইলেও বিরক্ত হতাম। বিজ্ঞানের যুগে মনে হত অবৈজ্ঞানিক আচরণ।

প্রথম পর্যায়ে বাধ ভাঙ্গা প্রেমের প্রকাশ, দ্বিতীয় পর্যায়ে বৈজ্ঞানিক যুক্তি, তৃতীয় পর্যায়কে কেমন যেন নিরস করে দিল। সব থেকেও যেন কি ছিল না। ফলে আগমন চতুর্থ পর্যায়ের, যা অসহ্য কষ্টে ভরা। একের কষ্টের কথা শুনবার সময় অন্যের কোথায়। তাই আবার ফিরে এল চিঠি। ফুরসত পেলে পড়ে নিও, কোন চাপ নেই। এই চিঠিও এক দিনলিপিই। তবে অনেকটা পরিনত মানসিকতার চিহ্ন সহ। কিছু ছিল প্রথম থেকেই যার জন্য কাহিনী প্রথম, দ্বিতীয় তৃতীয় পেরিয়ে চতুর্থ পর্যন্ত গড়াবার সুযোগ পেয়েছিল। সেটাই কাহিনীকে নিয়ে গেল পঞ্চম পর্যায়ে। পঞ্চম পর্যায় হল মসৃন, ভাল লেগে পথচলার রাস্তা। যার আছে সুনির্দিষ্ট গন্তব্য, ষষ্ট থেকে সপ্তম পর্যায়ে উন্নিত হবার। এতক্ষণ ছিল দুটি মন একটি পথ আর এখন দুটি মন দুটি পথ। চেষ্টা শুধু পথ দুটিকে সমান্তরাল রাখবার। যেন দুরত্ব সৃষ্টি না হয় কখনও।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুর দিকে এক বড় ভাই বলেছিল, জীবন হচ্ছে নদীর মত আর আমরা তাতে নৌকা বইছি। চলার পথে কিছু কচুরিপানা খানিক্ষণ নৌকাকে সঙ্গদেয় তারপর পিছিয়ে পড়ে। জীবনের নানা পর্যায়ে পাওয়া বন্ধুরাই সেই কচুরিপানা। এদের মাঝের দুই একজনকে আমরা ভালবেসে নৌকায় তুলে নেই, তারাই আসল বন্ধু। বাকিরা হয় ছাত্রজীবনের সহপাঠী, সতীর্থ অথবা কর্মজীবনের সহকর্মী।

ডায়েরির পাতার সেই সহচারী চরিত্রগুলো কবে যে সহপাঠী থেকে সহকর্মী হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। যখন বুঝলাম দুজনের এক পথচলার ইতিতে পৌছেছি মন খারাপ হয়েছিল, তবে সময়ের দাবীতে আলাদা পথকে সমান্তরাল করে নিতেও সময় লাগে নি। শুরু হল নতুন পথে চলা, সাথে সাথে নিজের অজান্তেই ডায়েরির পাতা গুলোর ধরন পালটে গেল। একটা সময়ের অভিযোগের লাইন গুলো এখন দৃঢ় বাস্তবতা। সেগুলো কেন ঘটে প্রশ্নের উত্তর এখন, “এইটাই সিস্টেম”। টিপাই মুখের বাঁধ বা ধেয়ে আসা সোয়াইন ফ্লুর জন্য কোন অবকাশ নেই। নিজের স্বার্থেই খোজ নিতে হয় অর্থনৈতিক মন্দা কতদূর। খেয়াল করলাম, অনেকদিন ধরেই কোন ব্যাপারে উত্তেজিত হই না। স্বার্থ ছাড়া অন্য বিষয় নিয়ে খুব কমই ভাবি। নিজেকে কেমন যেন চালাক চালাক মনে হয়।
জীবনের বাস্তব দৌড়ে একদিন দেখি, একবন্ধু ফেসবুকের স্টাটাস লিখল, “What is the meaning of life?”। বিদেশে পড়তে গিয়ে প্রতিদিন নতুন নতুন কি শিখল তার আপডেট লিখত সে। এর মাঝে হঠাৎ এইসব ভাববাদী কথা বার্তা বন্ধুতালিকার সদস্যরা তামাশা হিসেবেই নিল। দুইদিন পরে বন্ধু ডিজুস স্টাইলে উত্তর দেয়, “আরে মাম্মা! একটু ডিসটার্ব ছিলাম”।

একটা সময় জীবনটাকে দেখতাম বাসে মানুষের ঠেলাঠেলিতে, রিক্সা ওয়ালার রিক্সা টেনে নেওয়াতে। এখন দৃষ্টি পালটে গেছে। পালটে ফেলতে হল বলব না, নিজের জ্ঞাতসারেই পালটে গেছে। জীবনকে এখন ততটুকুই দেখা হয়, যতটুকু মানুষ দেখায়। এর গভীরে ঢুকবার আর আগ্রহ নেই। পালটে গেছি আমি, পালটে গেছে আমার সাথীরা। সবার সাথে পালটে গেছে আমার ডায়েরির পাতা। পড়লে মনে হয়, এটা এখন আসলে প্লানিং খাতা। এক অন্যরকম দিনলিপি।

~ অন্যরকম দিনলিপি ~

Read Full Post »

ব্লগ কথন

আজ কোন বিশেষ দিন নয় এমন কি নয় আমার ব্লগিয় কোন আলাদা দিন। আজ হয়নি আমার শততম পোস্ট, বর্ষপূর্তি বা লক্ষ হিট। তবুও আজ ব্লগ ইতিহাস নিয়ে লিখতে মন চাইছে। বছর দেড়েক হতে চলল এই ব্লগ আমার দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্দ অংশ। কত ব্লগার এল কত ব্লগার গেল, কত জন আজও থিতু হয়ে রইল এই সাইটে। এক কি দেড় বছর পুরোনো ব্লগাররাই আগের ব্লগ বলতে নস্টালজিয়ায় ফিরে যায়। ক্যালেন্ডারের পাতার সাথেই ব্লগে এক একটি জেনারেশন ইতি নেয়, নিজের অজান্তে স্থান দিয়ে যায় নতুন দের।

সব কিছুর মাঝেই অনেকের প্রতি জেগে উঠে মায়া, বন্ধুত্ব আবার ঘৃণা। ব্লগিয় প্রেম জেগে উঠবার অবশ্য সুযোগ আমার হয় নাই। এক সময় ব্লগে খুব আড্ডা চলত। বিশেষ করে শামিম, মুনিয়া, আউলা এদের ব্লগে। শামীমের রাত বিরাতের আড্ডা এখন আর তেমন হয় না। মুনিয়া, আউলা আমার মতই গায়েব। সাজি আপু, নিবেদিতা, চিটি আপুদের একটার পর একটা কবিতা আসত আর হজমও করতাম। নিবেদিতা আপুর অবশ্য অনেক দিন পর পর কবিতা ছাড়তেন। তাগাদা দিলেই একটা কবিতা বের হত। অন্য দিকে সাজি আপুর কবিতার সাজি আমার কাছে বরাবরই আশ্চর্যময়। এত এত কবিতা একজন মাত্র কবি কিভাবে লেখে!! চিটি আপুর প্রতিবাদ মুখর কবিতা গুলো অন্যদের থেকে পৃথক। তাদের সবার সহজবোধ্য কবিতা গুলো মিস করি প্রায়ই।

একটা সময় চিকন মিয়ার ক্রেজ সব সীমা অতিক্রম করে গেল। তারপর শুরু হল চিকন মিয়া ঘেরা পোস্ট এখন অবশ্য খোদ চিকনমিয়া এবং তাকে কেন্দ্র করে দেওয়া পোস্টের হার অনেক কমে গেছে। হয়ত চিকন মিয়ার প্রতিনিয়ত মোটা হওয়াই এর পেছনের কারন। একবার শত পোস্টে প্রায় সাত আটশত ব্লগারেরে নাম দিয়েছিলাম। এত ব্লগারের ভিড়ে ব্লগার রোবটের নামটা হারিয়ে যায়। রেগে রোবট ভাই/বোন আলাদা পোস্ট দিয়েছিল। সেই থেকে তার নামটা আমি কখনই ভুলি না।

এখন বলি নিজের কথা। একটা সময় এই ব্লগ খুব উত্তেজনায় পরিপূর্ণ রইত। বিষয়ের অভাব হত না কখনই। অনেক পোস্টে কতই না যুক্তি পালটা যুক্তির খেলা খেলেছি। আমি অবশ্য আস্তিক-নাস্তিক, বিবর্তনবাদ এই বিষয় গুলো নিয়ে মাতামাতি বেশি করতাম। কোথাও আমার চিন্তার বিপরীত কিছু দেখলেই যুক্তি খন্ডনের জন্য নেমে পড়তাম। মাঝে মাঝে আসতাম রাজনীতির আলোচনায়। সবক্ষেত্রেই একই প্রতিযোগিতা, একই উত্তেজনা। দিনের বেলা বাইরে গেলেও মাথায় ঘুরত ব্লগ। যুক্তি পালটা যুক্তি, প্রশ্ন পালটা প্রশ্নের খেলার মজার এক জগত।

ভাবতে অবাক লাগে, এখন এসব বিষয়ে প্রথম পাতা ভরা অথচ এগুলোর নিয়ে মাতামাতি করার কোন আগ্রহ আমার নাই। অনেকে আজও এসব নিয়ে ঝগড়া বিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের ধৈর্য দেখে আমি হতবাক হই বারে বারে। আমি বরাবরই সিরিয়াস মুডে ব্লগিং করে এসেছি। ব্লগের নানা বিষয় আমি সিরিয়াসলি নিতাম। চানাচুর একদিন বলেছিল, ব্লগিংকে সিরিয়াসলি নেবার কি আছে। আমরা নানা প্রান্ত হতে এই ব্লগে মিলিত হয়েছি, একদিন বিদায় নেব। একটা ওয়েবসাইটকে সিরিয়াসলি নেবার কিছু নাই। তখন বলেছিলাম আমি ভিন্ন মত প্রকাশ করি। এখন আমার মন অবশ্য পরিবর্তন হয়েছে।

মন্তব্যে ঝগড়া ঝাটি আর ভাল লাগে না। লিখতে বড্ড ইচ্ছা করে, অথচ লিখতে বসতে ক্লান্ত লাগে। ব্লগ পড়ি নিয়মিত। প্রতিদিনের এমন কোন পোস্টই হয়ত থাকে না যা আমি দেখি নি। কিন্তু মন্তব্য করতে বড় আলসে লাগে। লিখতে খুবই ইচ্ছা করে, সেই পিপাসা মিটাই গানের পোস্ট দিয়ে। আমি গানের কলি গ্রুপ খুলেছিলাম। এর সদস্য সংখ্যা ১০০ হবার পরে পোস্ট দেবার ইচ্ছা ছিল। আলসেমীতে আর দেওয়া হল না। এইতো কয়েক মাস আগে চারিদিকে আইডিয়া খুজতাম ব্লগে লিখবার জন্য। অথচ, এখন আর তা করা হয় না।

ব্লগের শুরু থেকেই দেখছি ব্লগাররা আড্ডা দেয়, যোগাযোগ করে। এই ব্যাপারটায় আমি কখনই আগ্রহ পাই নি। এইবার বইমেলায় প্রথম কোন ব্লগার মিলন মেলায় যোগ দেই। কারন একটাই, সেটা ছিল সাজি আপুর ব্লগিয় বইয়ের মোড়ক উম্মোচন। ব্লগার সাজিতে সেই দিন নিজেকে অন্যরকম লাগছিল।

যারা আমার ব্লগিংএর প্রথম দিকের সাথি তারা হয়ত মনে করতে পারবেন আমার প্রথম পোস্ট গুলোর কথা। সব মন মরা পোস্ট থাকত। কানা বাবা মন্তব্য করত আমার পোস্টে ঢুকবার আগেই জানে মন খারাপ হয়ে যাবে। তবে মন খারাপের সেই দিনগুলোতে ব্লগ আমাকে ভাল সময় কাটাতে দিয়েছে। প্রতিটি মানুষের গঠনের ক্রিয়াকালাপ যেমন এক তাদের মন খারাপের ধরণ গুলোও বোধ হয় এক। দেখা যেত, আমি যা নিয়ে মন খারাপ করে কিছু লিখতে চেষ্টা করছি, অন্য কেউ তাই লিখে ফেলেছেন ইতিমধ্যে। তখনকার দিনগুলোতে ব্লগই ছিল আমার ডায়রী। নিজের সব কিছুই লিখতাম। মন খারাপের গান লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। এখন ব্লগে আর মন খারাপের কথা লিখে মানুষকে বিরক্ত করি না।

আর কি বলব………………… স্টক শেষ। আল্লাহ হাফেজ।

ব্লগ কথন

Read Full Post »

Older Posts »