Feeds:
পোস্ট
মন্তব্য

Archive for ডিসেম্বর, 2008

গতকাল রাত থেকে একটা আলাদা আমেজ। আজ ভোট তাই তেমন কোন কাজও নেই। ঘুমাতে ঘুমাতে রাত ৩ টা বেজে গেল। সকালে উঠলাম ১১ টার দিকে। নাস্তা করে ভাবলাম আগে আমি ভোটটা দিয়ে আসি, তারপর মা আর ছোট বোনকে নিয়ে যাব।

তো বের হলাম। স্থানীয় কামরুন্নেসা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভোটকেন্দ্র। কেন্দ্রের সামনে আওয়ামী লীগ, বিএনপির লোকজন ভোটারদের সিরিয়াল নম্বর জানাতে বুথ খুলে বসে আছে। আমি যেদিক দিয়ে ঢুকলাম তার চারিদিকে আওয়ামী লীগের লোকজনই বেশি দেখলাম। যাইহোক, ঢুকলাম ভিতরে। স্কুলের এক দেওয়ালে কোন বুথে কত থেকে কত সিরিয়াল ভোট দিবে তার লিস্ট টাঙানো। আমার সিরিয়াল ১২৭ ছিল প্রথম বুথে (১ থেকে ৫০৪)।

লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। প্রতিবারে পাঁচজন পাঁচজন করে ভেতরে ডাকছে দো’তালায় ভোট দিবার জন্য। আমার সামনে এক চাচা ছিলেন, অন্যরা সবাই প্রথম ভোটার। চাচা খুব খুশি ভোট দিতে পেরে। উনি জানালেন, ভোট দিতে পারাটাই সৌভাগ্যের ব্যাপার। তার যৌবনের কোন এক নির্বাচনে ভোট দিতে এসে কেন্দ্রের প্রবেশস্থল থেকেই তাকে বিদায় জানানো হয়েছিল। এলাকার কিছু দলীয় কর্মী তাকে জানিয়েছিল তার ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। তিন/চার দশক পরে আজও সেই দলীয় কর্মীকে চাচা কেন্দ্রের প্রবেশস্থলে বসে থাকতে দেখলেন। তবে এইবার তার ভোট তিনি দিতে পেরে আনন্দিত। অন্য একজন পোস্তগোলা হতে এসেছেন ৫০ টাকা রিক্সা ভাড়া খরচ করে ভোট দিতে। বললেন একবছর ধরে তার অপেক্ষা ভোট দিবার জন্য।

যাইহোক, আমাদের ডাক পড়ল। ভেতরে গেলাম, পোলিং অফিসার সিরিয়াল নম্বর জিজ্ঞাসা করলেন। বলবার পরে আমার নাম ও বাবার নাম জিজ্ঞাসা করলেন। কেউই ছবির সাথে চেহারা মিলাতে আগ্রহী নয়। আমি নিজেই নিজেকে ঐ ছবি দেখে চিনব না, ঐ ব্যাটা কি চিনবে। একজন হাতে কালি লাগিয়ে দিলেন, অন্য একজন ব্যালট পেপারের একটা অংশে সিগনেচার নিয়ে বাকি অংশ আমাকে ছিড়ে দিলেন (এই অংশেই ভোট দিতে হবে)। আমি ভাজ করার ব্যাপারটা জিজ্ঞাসা করে নিলাম, কোন এক দলের পোলিং এজেন্ট আমাকে তা দেখিয়ে দিলেন। দুই দলের পোলিং এজেণ্টই ছিল বুথের ভেতর ওরাও সিরিয়াল শুনে নাম বাবার নাম মিলিয়ে নিল। ভালভাবে বলবার পরেও অহেতুকই এক দলের পোলিং এজেন্ট খেকিয়ে বলে উঠল, “ভালভাবে কন না কেন?”।

যাইহোক, ব্যালট নিয়ে নির্ধারিত অংশে গেলাম ভোট দিতে। ভোট দিলাম, নিয়ম মত ভাঁজ করে ব্যালট বাক্সে ফেললাম। শেষ হল আমার ভোট দেওয়া। আমাদের এলাকার অবস্থা একেবারেই শান্তিপূর্ণ। বেরিয়ে দেখি আমাদের গলির লন্ড্রির একছেলে এক বৃদ্ধের সাথে কথা বলছে। উল্টোদিক হতে অন্য একলোক দেখলাম ছেলেটাকে হুমকির সুরে জানাল, “বেশি বুঝাইতে যাইও না, ধরায়া দিমু কিন্তু”। লন্ড্রির ছেলেটাকেউ দেখলাম খেকিয়ে উঠল। এই হালকা ব্যাপারটা ছাড়া আমার চোখে আর কিছুই দৃষ্টিকটু লাগে নাই।

আগে ভেবেছিলাম ভোট দিতে যাব না। তারপর ভাবলাম “না” ভোট দেব। পরে চিন্তা করলাম ভোট না দেওয়া বা “না” ভোট দেওয়া কোন সমাধান নয়। তাই আমি একটি দলের পক্ষে ভোট দিয়েছি। ক্ষমতায় গেলে তারা আমার আশা পূর্ণ করতে পারবে কিনা তা নিয়ে আমি সংশয়ী। তাদের ভবিষ্যত কর্মকান্ড যদি গ্রহণযোগ্য হয় তবে শান্তি পাব, আবার তা দেশের স্বার্থবিরোধী হলে নিজেই অনুশোচনায় ভুগব। কারন তাদের ক্ষমতায় বসানোর মত অপরাধ যারা করল আমিও তাদের একজন হয়ে পড়ব। তাদের নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্তে আমার ম্যানডেট থাকবে, এটা হবে আমার জন্য চরম অনুশোচনার কারন।

আজ নিজেকে দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার একটা অংশ বলেই মনে হচ্ছে। কেমন যেন একটা দায়িত্ববোধের অনুভব পাচ্ছি। যাদের ভোট দিলাম, তাদের ভবিষ্যতের প্রতি পদক্ষেপের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা আমার জন্য ফরজ কাজ আজ থেকে। যদি আমার ভোট দেওয়া দল নির্বাচনে পরাজিত হয় তবে আমার এইবারের সিদ্ধান্ত ভুল না সঠিক তা প্রমানিত করার দায়িত্ব আসবে সরকারী দলের। এখন শুধু দেখবার পালা কি হয়!

Read Full Post »

প্রথম পর্যায়:

রোজার ঈদের নামাজ পড়ে  আমাদের এপার্টমেন্টের দুই তলায় এক বাসায় গিয়েছিলাম আমি আর আমার বাবা। ভদ্রলোক এক অবসরপ্রাপ্ত সচিব, তার স্ত্রী মারা গেছে, ছেলেরা আমেরিকায় আর উনি একা থাকেন। বর্তমানে একটি ইসলামী বাংকের চেয়ারম্যান ও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কনসাল্টন্ট হিসেবে আছেন। লোকে বলে উনি নাকি সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন লেখা পড়ায় এবং ইবাদত বন্দেগীতে।

আমাদের উনি পায়েস খেতে দিলেন, সেই সাথে জ্ঞানের আলাপ শুরু করলেন। ভাল ভাল কথাই বলছিলেন। উনি বললেন, “নাজাফে কোন এক মসজিদে কিছু খ্রিস্টানরা কি এক কাজে এসেছিল।  খ্রিস্টানদের উপাসনার সময়ে তারা বাইরে যেতে চাইলে মসজিদের মুসলিমরা খ্রিস্টানদের সেই মসজিদেই তাদের উপাসনা করতে অনুরোধ করে”। উনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “অথচ আমাদের দেশের মসজিদে অশিক্ষিত ইমাম অন্য ধর্মাবলম্বীদের ঢুকতেও দেয় না”। তাই উনি নাকি সচিব থাকাকালীন বাংলাদেশ সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন “ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমী গড়তে”। পরবর্তীতে সেটা হলেও তেমন কাজে আসে না। ইমামরা দুই মাস কোর্স করে  প্রায় ১৭/১৮ হাজার টাকার মত আয় করে, কিন্তু ফিরে গিয়ে ট্রেনিংএর কোন বাস্তবায়ন করে না। এই দুঃখে তিনি অবসর নেবার পরে নিজ অর্থেই ইমামদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার চিন্তা ভাবনা করছেন। ভদ্রলোকের এহেন নেক চিন্তা ভাবনার কথা শুনে তার প্রতি খুবই প্রীত হইলাম। শ্রদ্ধায় মনটা ভরে উঠল।

এরপর উনি শুরু করলেন ইতিহাসের কথা। আল বেরুনি নাকি বাংলাদেশে এসেছিল। এসে দেখে এই দেশে প্রতিদিন একবার নদীর পানি উঠে আর একবার নামে (জোয়ার ভাটা আর কি!)। এতে আল বেরুনী খুবই বিচলিত হইলেন কারন আলবেরুনির, ভৌগলিক কাঠামোর মানুষের আচরণের উপর প্রভাব সম্পর্কিত তত্ত্ব আছে। সেই তত্ত্ব মত আলবেরুনি নাকি তার বইতে লিখে গেছেন বাঙালিদের আচরণের ঠিক ঠিকানা নাই। এরা বিপদজনক এবং উনিও তাই ভয়ে বাংলায় এসেই দ্রুত চলে যান। আলবেরুনীর সাথের জিনিস পত্রও নাকি বাঙালিরা চুরি করে নিয়েছিল। এরপর আরো যা যা বললেন তা মূলত ছিল বাঙালিদের নিন্দা।  শুনলাম মন খারাপ করলাম, কিন্তু কিছু বলার ছিল না। প্রথমত উনি কিছু রেফারেন্স সহ কথা বলছিলেন এবং ইমাম প্রশিক্ষণের কথা বলে আমার মনে নিজের একটা গ্রহণযোগ্য ও শ্রদ্ধার ইমেজ তৈরি করে ফেলেছিলেন। তবে, একটা ব্যাপার খটকা লাগছিল যে তিনি ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধের স্থলে গন্ডোগোল শব্দটিই ব্যবহার করতেন। যাইহোক, তখন তো আর এত কিছু বুঝতাম না।

দ্বিতীয় পর্যায় – গত বছরের একুশে বই মেলা:

মেলায় ঘুরতে ঘুরতে, দিব্যপ্রকাশের স্টলে আলবেরুনীর ভারততত্ত্ব বইটি চোখে পড়ল। বইটার কথা আগে যদিও শুনেছিলাম কিন্তু তখন ঐ বুড়োর কথা মাথায় ভেসে উঠল। ভাবলাম আল-বেরুনীর মত বিখ্যাত ব্যক্তি আমাদের বাঙালিদের সম্পর্কে কি ধারণা করেছিলেন তা জানা দরকার। বইটা কিনে ফেললাম সাথে সাথে।

তৃতীয় পর্যায়-বাসায় ফিরে:

বইটা শেষ পর্যন্ত পড়লাম। আল-বেরুনী কখনই বাংলায় আসেননি। উনি এক প্রকার বন্দী হিসেবে গজনীর সুলতান মাহমুদের সৈন্যদের সাথে উত্তর ভারতের সিন্ধু ও পাঞ্জাবের কয়েকটা শহরে কিছু দিন ছিলেন।  সেখানে হিন্দুদের সাথে তার পরিচয় হয় এবং তিনি তাদের সাথে আলোচনা করে ভারততত্ত্বর মত বই লেখেন। পুরো বইতে একবার মাত্র “বঙ্গ” শব্দটি দেখলাম তাও একটা লিস্টে।

চতুর্থ পর্যায়:

বুড়ো সম্পর্কে খোঁজ নিলাম। সরকারি চাকুরীজীবি হিসেবে একাত্তরে আমেরিয়ায় ছিল, যুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে সাপোর্ট দেয় নি। দেশে আসে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে, আবার চাকরিতে যোগ দেয়। সে আর কিছুই না নিম্নমানের ধর্মব্যবসায়ী।  চান্স পেলেই বাঙালিদের দোষ বর্ণনা শুরু করে। বেশি চান্স দিলে হয়ত জামাত-শিবির বন্দনা শুরু করার ইচ্ছা রাখে।

উপসংহার:

লোকটা সিম্পলি গোয়েবলসীয় খেল দেখাল, আর কিছুই না । খুব ভাল মতই সে জানে, সাধারন মানুষের জ্ঞান সীমিত। মিথ্যা রেফারেন্স বা অর্ধ সত্য কথা বললে বেশির ভাগমানুষই তার সত্যতা উদ্ঘাটনে তেমন খোজ খবর নেবে না। সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। বিধায় সে এই মিথ্যা প্রচার করতে কোন বাঁধা দেখে না, আর আগেই একটা ইমেজ তৈরি করে নেয়। এই ইমেজের ভিত্তিতে হয়ত অনেকেই তার সম্পর্কে ভাবে, “লোকটা জামাতি হইলেও জ্ঞানী আছে” অথবা “জামাতিগুলা খারাপ হলেও ঐ লোকটা খুব জ্ঞানী, তারে জ্ঞানের জন্য শ্রদ্ধা করি” ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ একটু লেখাপড়া করলেই এদের রূপ বেরিয়ে পড়ে।

মাঝে মাঝে এসব দুষ্টলোকদের ব্যাপারে বিভিন্ন লোকের সাথে কথা হয়।  তারা বলেছেন, “ওরা দুষ্ট, যদিও ওদের মধ্যে থেকে অমুক দুষ্টটা খুব যুক্তিবাদী, জ্ঞানী, ভাল ভাল ধর্মকথা বলে ইত্যদি ইত্যাদি”। এই “ওরা”-গ্রুপের মধ্যে পড়ে জামাতী, অল্প কিছু নাস্তিকতা ধর্মে অন্ধ নাস্তিক, কিছু ধর্ম ব্যবসায়ী,  গুটি কয়েক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করে খাওয়া লোক এবং কিছু জ্ঞান পাপী।

উপদেশ:

সাধারন ব্লগারদের জন্য নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলি দুষ্ট লোকেদের ধর্মকথা থেকে সাবধান।  কেউ কিছু লিখে দিলেই তা বিশ্বাস করবেন না নিজে যাচাই না করে। আর এ জন্য বসেও থাকবে না যে অন্যকেউ দুষ্টলোকের ধর্মকথা যাচাই করে দেবে। আপনার মত অন্যরাও নিজ নিজ জীবনে ব্যস্ত। ফাকতালে কিছু দুষ্ট লোক মিথ্যা ধর্মকথার প্রচার করে যায়। তাই, হয় আগে যাচাই করে নিবেন সময় পেলে, নতুবা যেন তেন লোকের লেখা (মূলত কপি-পেস্ট) পড়ে নিজের মনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে না। এদের সাথে যুক্তি তর্কে নামবেন না, কারন এই সব ধান্ধাবাজরা যুক্তি মানবে না এমন ব্রত নিয়েই এসেছে। অহেতুক তর্ক সৃষ্টিকরেই, এরা জনপ্রিয়তা চায়। এই দুষ্টলোকেরা তাদের ধর্মকথা নিয়ে আপনার আমার আসে পাশেই ঘুরছে। সেই দুষ্টলোকের ধর্মকথাকে বাহবা দেবার আগে কয়েকবার জ্ঞানের আলোকে চিন্তা করুন।

Read Full Post »

কিছুদিন আগে ন্যাটজিওতে একটা প্রোগ্রাম দেখলাম “The Indian Witch”, বাংলায় যা হবে ‘ভারতীয় ডাইনী’। সেই প্রোগ্রামে এক ল্যাংটা বাবাকে দেখিয়েছিল যে কিনা কাল যাদু (Black Magic) জানে।  ঐ বাবার দাবী কালযাদুর জ্ঞান দিয়ে সে যেকোন মানুষকে মেরে ফেলতে পারে, অনেক দূর থেকেই। তবে সে বিনা প্রয়োজনে সেটা করে না কারন এতে তার জ্ঞানের মর্যাদাহানি ঘটে। যদিও ঐ প্রোগ্রামে দেখানো হয় লোকটা ভূয়া কিন্তু তার একটা কথা আমার ভাল লেগেছেলি। তা হল, ‘জ্ঞান হল মানুষের উপর একটা দায়িত্ব, এটাকে খুব যত্ন করে লালন করতে হয় এবং মানুষের উপকারে ব্যবহার করতে হয়’। উক্তিটি খুবই গুরুত্বপূর্ন বিশেষ করে বর্তমান পেক্ষাপটে। পৃথিবীতে সব মানুষ জ্ঞানি হয় না, কিছু লোক হয়। তাদের বাকিরা অনুসরণ করে। তারা যদি জ্ঞানের অপব্যবহার করেন, তার অনুসারীরা তাই করে। বিধায় প্রথম ব্যক্তির (যে কিনা জ্ঞানি) অপরাধ মানুষের উপর অনেকগুন বর্ধিত রুপে কাজ করে। এর উলটোটিও সত্য। যে কোন জ্ঞানী ব্যক্তির ভাল কাজ অনেক অনেক মানুষ অনুসরন করে বিধায় জ্ঞানীর জ্ঞানের প্রভাব বহুগুনে বৃদ্ধি পায়।

এমনি এক জ্ঞানী মানুষ হিটলারের তথ্য মন্ত্রী যোসেফ গোয়েবলস। ইহুদি নিয়ন্ত্রিত এই বিশ্বে হিটলার ও তার সাথিরা চরমভাবে ঘৃণ্য এবং সেই সাথে আলোচিত। তবে গোয়েবলসকে যে যাই বলুক, উনি যে অত্যন্ত জ্ঞানি ও মেধাবী ছিলেন সেটা উল্লেখ করতে কেউ ভোলে না। আমি এ পর্যন্ত নানান বইতে, ইন্টারনেটে যেখানেই গোয়েবলস্‌ সম্পর্কে কিছু পড়েছি তার শুরুতেই বলে নেওয়া হয় লোকটা অনেক মেধাবী ও জ্ঞানী ছিল। তারপর বলা হয় সে যা করেছে তা ঠিক করে নাই, সে খুব খারাপ ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই ধরে নিচ্ছি গোয়েবলস্‌ আসলেই খুব মেধাবী ও জ্ঞানীই ছিলেন।

এই ব্যক্তির বিশেষ অবদান হচ্ছে, মিথ্যাকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করবার অত্যন্ত ফলপ্রসু পদ্ধতি উদ্ভাবন। ১৯৪৫ সনে হিটলারের ব্যাংকারে সপরিবারে আত্মহত্যা করে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও বর্তমান বিশ্বে সবচাইতে প্রভাবশালী দার্শনিক মূলত গোয়েবলস। পশ্চিমা বিশ্বে এরিস্টোটলের দুইহাজার বছর ধরে যে প্রভাব বিদ্যমান ছিল, আমাদের এই বিশ্বে গোয়েবলসের প্রভাব তার চাইতে কমতো নয়ই বরং অনেক অনেক বেশী। মিথ্যা প্রচারে গোয়েবলসের পদ্ধতি হল, প্রথমে একটা কনফিউশন সৃষ্টি কর, তারপর ব্যাপক প্রচার কর। একসময় মিথ্যাটাই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। বার বার মানুষের কানের কাছে একটা রেকর্ড বাজাতে থাক কাজ হবেই হবে। যতই নিন্দা করি গোয়েবলসের সত্যিই এ এক নিঁখুত অস্ত্র।

গোয়েবলসীয় দর্শনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হল ‘আজকের দুনিয়ার মার্কেটিং’। যার মূল মন্ত্র , ‘স্যাব কুচ বিকতাহে, ব্যস এক বেচনে ওয়ালা চাহিয়ে’ (হিন্দি সিনেমার পপুলার ডায়লগ)।  যেমন, রিমো নামে ভারতের এক মিউজিক ডিরেক্টর আছে যিনি আধুনিক ধুমধাড়াক্কা গান কম্পোজ করেন। তার একটা গান (কোনটা তা মনে নাই) এক সময় খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। আমার মা সেই গানটা কোথাও বাজতে শুনলেই বিরক্ত হয়ে কিছু অবশ্যই বলত। মা বলত, কোথায় সেই হেমন্ত, কিশোর, লতা, এসডি বর্মন, আশা আর কোথায় আজকের এই ফালতু রিমো। একদিন হঠাৎ খেয়াল করি আমার মা রান্নাঘরে তরকারি কুটছে আর গুন গুন করে রিমোর সেই ধুম ঢাড়াক্কা গানটাই গাচ্ছে। খুবই অবাক হলাম আমি সেদিন। অদ্ভুত! তবে সত্যি হল এই যে, বার বার টিভিতে, গানের দোকানে বাজাতে বাজাতে মানুষের মস্তিস্ককে ঐ গান ভাল লাগাতে বাধ্য করা হয়েছে।  আমার এক বন্ধুর বাবা কোকাকোলা কম্পানিতে চাকরি করতেন মিডলইস্টের কোন দেশে। তখন কোকের দাম ছিল ১০টাকা। উনি নাকি বলেছিলেন, এই ১০ টাকার মধ্যে কিছু অংশ ট্যাক্স, ২ টাকার জিনিস বোতলের ভিতরে আর বাকিটা আমির খান, শাহরুক খান, কারিনারা বিজ্ঞাপন করে নিয়ে যায়।  বার বার বিজ্ঞাপন দেখিয়ে আমাদের তৃষ্ণার সময় পানি না কিনে কোক-পেপসি প্রভৃতি কিনতে বাধ্য করা হয়।  কিছুদিন আগে History চ্যানেলের একটা প্রোগ্রামে দেখলাম আমেরিকা তার so called সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধে যে সব ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে গুয়ান্তেনামো জাতীয় কারাগারে বন্দি রাখে তাদের কানের কাছেও নাকি আমেরিকার জয়গান করা নানা ধরনের গান অবিরত বাজতে থাকে। উদ্দেশ্য একটাই বন্দিদের মনে আমেরিকার জন্য শ্রদ্ধা বা ভয় জাগ্রত করা আর পন্থা সেই গোয়েবলসীয়।

তবে গোয়েবলসের তত্ত্বের সব চাইতে নোংরা ব্যবহার ঘটে রাজনীতিতে। ডান, বাম, সাম্প্রদায়িক, অসাম্প্রদায়িক, ধার্মিক, ধর্ম নিরপেক্ষ, আস্তিক, নাস্তিক কেউ কারো চাইতে এখানে কম না। যেমন আমাদের দেশে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়নি এই প্রোপাগান্ডা যতটা শক্তিশালি ঠিক ততটাই শক্তিশালি পোপাগান্ডা হচ্ছে আওয়ামী লীগ ভারতের দালাল। যেখানে একটা গ্রুপ রবীন্দ্রনাথকে কবি সাহিত্যিক থেকে মহাপুরুষ পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন, ঠিক অন্যদিকে আর একটা গ্রুপ খুব পোক্ত ভাবেই অশিক্ষিত জনসাধারণের মাঝে এটা প্রতিষ্ঠিত করেছে যে রবীন্দ্রনাথই হিংসা করে নজরুলকে অসুস্থ করেছিলেন।  অনেক ক্ষেত্রেই এই ব্যাপার গুলো হাস্যকর কিন্তু গোয়েবলসীয় প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে এইগুলোই বিশ্বাস করতে বাধ্য করা হয়েছে। স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি, আমি নিজেও কলেজ পর্যন্ত এই জানতাম যে রবীন্দ্রনাথই নজরুলকে হিংসা করে অসুস্থ করেছিলেন। কে যেন একবার এক ব্লগে লিখেছিলেন, তার দারোয়ান বিশ্বাস করে কবি নজরুল ভাল লোকই ছিল, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মেয়েকে বিয়ে করেই বারোটা বাজিয়েছে। আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক বন্ধু বিশ্বাস করে হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ আর একবার বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হতে চায়, কারন সে নাকি তার সুইস ব্যাংকের একাউণ্টে সিগনেচার দিয়েছে “রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ” লিখে। তাই এরশাদ আর একবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে সিগনেচার দিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে চায়। এই হচ্ছে শিক্ষিত মানুষের অবস্থা, অশিক্ষিতদের কথা বাদ। সাধারন মানুষ এরকমই বিধায় তারাই গোয়েবলসের অনুসারীদের টার্গেট।

গোয়েবলসীয় তত্ত্বকে সব চাইতে বেশি ব্যবহার করেছে তার বস হিটলারের সারা জীবনের শত্রু ইহুদীরা। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস!  যে হিটলার, গোয়েবলস ইহুদীদের পৃথিবী হতে নিশ্চিহ্ন করতে উঠে পড়ে লেগেছিলেন, তাদের তত্ত্বই আজ ইহুদীদের বিশ্বে শক্তিশালি করতে ভূমিকা রাখছে। সামরিক ক্ষেত্রে শক্তিশালী আমেরিকাকে কুক্ষিগত করে ইহুদিরা এখন বিশ্বে খুবই শক্তিশালি। যুগের পর যুগ যেই খ্রিস্টানদের দ্বারা ইহুদিরা নির্মমভাবে নির্যাতিত হয়ে আসল তারাই এখন ইহুদিদের হাতের পুতুল। তাদের সব চাইত বড় শত্রু এখন ইসলাম। অথচ, বিগত ১৪ শত বছরে ইহুদিরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্বাধীনভাবে নিজেদের ধর্ম পালনের সুবিধা পেয়েছে মুসলমানদের থেকে।

মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে সব চাইতে বড় বাধা যেখান থেকে আসছে সেটা হল মুসলমানদের মধ্যে ধর্ম ভিত্তিক একতা। তাই ইহুদি মিডিয়ার সব চাইতে বড় টার্গেট স্বয়ং ইসলাম ধর্ম। তবে সেটা নাস্তিকতার মোড়কে ইসলামের বিরুদ্ধে চলে। গোয়েবলসের তত্ত্ব অনুসরণ করে ইহুদিদের মিডিয়া প্রথমে ধর্ম সম্পর্কে কিছু নেগেটিভ ব্যাপার ফুটিয়ে তোলে, যা মানুষকে যাচ্ছেতাই করতে বাধা দেয়, তারপর কিছু প্রশ্ন তোলে। এরপর শুরু হয় সেগুলোর ব্যাপক প্রচার টিভিতে, সিনেমায়, ইন্টারনেটে নানান ওয়েব সাইটে, সেই সাথে কিছু পেইড কালামিস্ট দিয়ে সংবাদপত্রে এবং হয়ত বা ব্লগেও। আবার এমন কিছু ইসলামী ওয়েব সাইট পাওয়া যায় যেগুলোতে খুব সুন্দর ভাষায় ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা প্রচার করা হচ্ছে, অথচ এই সবগুলোর উৎস একই।  ব্যাপার গুলো এমনভাবে সাজানো হয় যে অমুসলিমরা দেখলে ভাববে সবই ইসলাম ধর্মের খুত, তাদের ধর্মেতো এমন নেই। অন্যদিকে সাধারণ মুসলমানেরা ভাববে এইগুলা ধর্মের খুত, চল সবাই নাস্তিক হই।  এই সবই মহান গোয়েবলসের তত্ত্বের ফসল।  এই সবের প্রমান পাওয়া যায় দুটি ব্যাপার লক্ষ্য করলে:

১ বেশির ভাগ নাস্তিকের প্রশ্ন ইসলাম কেন্দ্রীক। ভাবটা এমন যেন বিশ্বে অন্য কোন ধর্ম নেই।

২ নাস্তিকদের প্রশ্নে কোন বৈচিত্র নেই। গুগল, ইয়াহুতে atheist লিখে সার্চ দিলে খুব সহজেই নাস্তিকদের যেইসব প্রশ্ন গুলো পাবেন সেগুলোই দুনিয়াভরের নাস্তিকেরা কপচাতে থাকে নানান মিডিয়াতে।

আবার এই ক্ষেত্রে ধর্ম ব্যবসায়ীরাও কিন্তু পিছিয়ে নেই। তাদের অনেকেরই গুরু সেই মহান গোয়েবলস। নানান মিডিয়ায় (টিভি চ্যানেল, ইন্টারনেট, সংবাদপত্র এমন কি ব্লগ) এরাও সৃষ্টিকর্তার প্রমান, কোন ধর্ম ভাল, কোনটা খারাপ, বিজ্ঞানের কি কি নেওয়া যায়, কি কি বাদ দেওয়া যায় প্রভৃতি নিয়ে দোকান খুলে বসেছে। অনেকে আবার সিডি/ডিভিডি বা চটি বইয়ের ব্যবসাও করে থাকেন।

আমাদের ব্লগীয় কিছু এছলামী ব্লগার ও নাস্তিকতা নামক ধর্মে বিশ্বাসী ব্লগার উভয় গ্রুপই ঐ সব ওয়েবসাইট থেকেই ডাইরেক্ট কপিপেস্ট মারেন। ধর্ম সম্পর্কে যদি কারো প্রশ্ন থাকে তবে নিজেই তার উত্তর খোজ চেষ্টা করা উচিত।  ওদের রেফারেন্স মত চলে বিভ্রান্ত হওয়া খুবই ক্ষতিকর। এটা আস্তিক ও নাস্তিক (যারা কোন সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেন না তাদের কথা বলছি, নাস্তিকতা ধর্মে বিশ্বাসীদের কথা বলছি না) উভয়ের ক্ষেত্রেই সত্য। অহেতুক অর্ধ শিক্ষিত মোল্লা-মুন্সি বা প্রোপাগান্ডাকারি নাস্তিকতা ধর্মে বিশ্বাসীদের সাথে তর্ক করে সময় নষ্ট করার কোন মানে নাই। কারন তারা এসেছে ব্যবসা করতে।

গোয়েবলস সত্যিই জ্ঞানী ছিলেন, কিন্তু জ্ঞানের দায়িত্ব নেবার যোগ্যতা তার ছিল না। ফলশ্রুতিতে, তার জ্ঞানের খেসারত আমাদের আজো দিতে হচ্ছে। তিনি যদি একই তত্ত্ব সত্য প্রচারে ব্যবহার করতেন তবে হয়ত আজকের বিশ্ব অন্যরকম হতে পারত।  তাই বলি লেখাপড়া শেখাবার সাথে সাথে এটা আমাদের উপর যে অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করে তা বুঝানোও জরুরি, নইলে জ্ঞানের অপব্যবহার চলতেই থাকবে।

(আমার যা বলার তা বললাম, এখন যার যা ইচ্ছা বলতে থাকেন।)

Read Full Post »

ঈদের আনন্দে অনেকেই পোস্ট দিচ্ছেন। নিশ্চয়ই তারা ঈদে খুব আনন্দ করেন, নইলে এমন সুন্দর সুন্দর লেখা হয়ত বের হয়ে আসতনা। ব্লগারদের দেখা দেখি লিখবার ইচ্ছা থেকেই আমার ব্লগিং শুরু। তেমনি, ব্লগারদের দেখা দেখি ঈদ সংশ্লিষ্ট পোস্ট একটা না দিয়ে পারলাম না। সত্যি কথা হচ্ছে, ঈদ আমার কাছে বিশেষ কোন আনন্দের দিন না। খুব চিন্তা করেও এমন একটা ঈদের স্মৃতি মাথায় আনতে পারলাম না, যেদিন খুব আনন্দ হয়েছিল। ঈদ আমার কাছে একটা নিতান্তই বোরিং সময়, যেদিন অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার আইডিয়া মাথায় ঘোরে। অথচ মন বলে আজ ঈদের দিনে এসব করা যাবে না, করাও হয় না।

আমি ছোট বেলা থেকেই ঢাকাতে। তখন বেশির ভাগ আত্মীয়-স্বজন ঢাকার বাইরে থাকত তাই ঈদে যাওয়া হত না কারো বাসায়।  স্কুলের কোন বন্ধু বান্ধব থাকত না কাছে ধারে তাই যাওয়া হত না। আর আশে পাশের বাসায় যাওয়া আমার বাবা একদমই পছন্দতো করতই না বরং গেলেও ধমক দিত। কারন আমারা ছিলাম নিতান্তই নিরীহ মধ্যবিত্ত পরিবার। আশে পাশে থাকত সব ঢাকাইয়া ফ্যামিলি, তারা বেশির ভাগ অশিক্ষিত কিন্তু পয়সা ওয়ালা। বাবা চাইত না আমরা ভাইবোন ওদের সাথে মিশি। তখন খুব রাগ হত বাবার উপর, কিন্তু সাহস করতাম না হুকুম ভঙ্গ করতে। এখন বাবাকে ধন্যবাদ দেই।  ঐ এলাকায় মেলামেশা করলে যাদের সাথে চলতে হত, তাদের কয়েকজনই এখন র্যা বের লিস্টেড সন্ত্রাসী, খুন হয়েছে দুই-একজন। তবে আমার স্বীকার করতেই হবে পুরান ঢাকার মানুষ নতুন ঢাকার মানুষের চাইতে অনেক অনেক বেশি ফ্রেন্ডলি।

দাদা মারা গেছেন অনেক আগেই। দাদি ঢাকায় থাকলে এলিফেন্ট রোডের দাদার বাড়িতে উঠত। তখন সারাদিন সেখানেই থাকা হত, কিছুই করার থাকত না। আজকালের মত এত টিভি চ্যানেলও ছিল না শুধু বিটিভি। পুরো সময়টা বসে থেকে, দুপুরে খেয়ে চলে আসতাম। ঈদ শেষ হত!

প্রায়ই ঈদ করা হত দেশের বাড়িতে। তখন বাবা আমাদের রোজার শুরুতেই দেশে বাড়ি রেখে আসত। প্রায় পুরো মাসটা গ্রামে ঘুরে ঘুরে অনেক মজা করতাম, যদিও একা একা।  বিরক্ত লাগত সেই ঈদের দিনে। সেই দিন নতুন বা অল্প নতুন জামা পড়তে হত, চাচা বা বাবার সাথে মানুষের বাড়িতে যেতে হত। নানার বাড়িতে ঈদ করেছিলাম একবার, সেটাও একই জাতীয় ছিল। সাজানো গুছানো ঘরে চুপচাপ বসে থাকা। সমবয়সী কেউ ছিলও না সেখানে।  বাবা মায়েরা আর কিছু না হোক ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাইরে ঘুরতেও বের হয়। কিন্তু আমার কপালে তাও জোটেনি কখনও।

ঈদে নিজে ঘোরাঘুরি শুরু হয় কলেজে উঠবার পর থেকে। এরপর আমাকে বাবা আর কিছুতেই বাঁধা দেয় নি। যা ইচ্ছা তাই করেছি। যেখানে ইচ্ছা গিয়েছি, যখন খুশি বাসায়া ফিরেছি। সেই ২০০০ সাল থেকে সবগুলো ঈদ আমার বন্ধুদের সাথেই কাটে। সকালে নামাজ পড়ে বের হয়ে যাই, আসি সেই বিকেলে বা সন্ধ্যায়। রাতে সবাই একসাথে খাওয়া দাওয়া করে, ঈদ শেষ। পর দিন থেকে শুরু হয় টিভিতে ঈদের অনুষ্ঠান দেখা। আমি খেয়াল করেছি ঈদের তিন চার দিন পর্যন্ত আমি টিভি অনুষ্ঠান গুলো দেখি। বন্ধুদের সাথে সারা বছরই ঘোরাঘুরি চলে, তাই ঈদের দিনেরটা বিশেষ আনন্দময় মনে হয় না।

ঈদের নতুন জামার ব্যাপারটা আমাদের বাসায় তেমন অবশ্য কর্তব্য কিছু না। তাই ঈদে নতুন জামা না পেলে কিছু একটা মিস করলাম এহেন মানসিকতা আমার নেই। কয়েকটা ঈদেই নতুন জামা পাওয়া হয় নাই। তবে বাবা না দিলেও, মামা অবশ্যই কিছু না কিছু দিতে চেষ্টা করে প্রতি ঈদে।  আমার বড় মামা আমার একটা অন্যতম বড় পাওয়া।  মামা আর কাউকে কিছু না দিলেও, আমাকে কিছু না কিছু উপহার দেয়। ছোট বেলায় মা নতুন জামা ঈদের আগে পড়তে দিত না। এই কাজটা এখন আর করতে পারে না। আমি ঈদের কয়েকদিন আগেই নতুন জামা পড়ে তার নতুনত্ব হরণ করি।  কেন জানি না আলাদা একটা মজা পাই এর থেকে।

তবে ঈদের একটা ব্যাপার আমার বছরের অন্য দিনগুলোর চাইতে আলাদা মনে হয়। সেটা হল খাওয়া দাওয়া। এমনিতে, আমাদের বাসায় সারা বছরই প্রচুর খাওয়া দাওয়া হয়। আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবার গুলোর সব দিকে যদিও লাক্সারিয়াস হতে পারে না, কিন্তু দুই একটা ক্ষেত্রে একটু ভাল থাকতে চায়। কেউ সাধ্যের মধ্যে ঘর সাজিয়ে রাখে, তো কেউ ভাল জামা কাপড় পড়ে, কেউ বেড়ায়, তো কেউ ভাল খায়। আমরা ভাল খাওয়া গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। আমার মা খুব ভালই রান্না করে, আর আমার বাবা সেই তালে তালে ভাল বাজার করে। সেই হিসেবে ঈদের দিনে খাওয়া বিশেষ কিছু মনে হবার কথা না, অথচ ঈদের এই একটা ব্যাপরই আমাকে টানে। ঈদের নামাজ পড়ে বাসায় ফিরে আমি অবশ্যই পোলাও এবং কোর্মা আশা করি। যদি না খাওয়া হয়, মনে হয় ঈদটা শুরু হল না। ঈদের দিনের পোলাও, কোর্মার স্বাদ আমার জিভে এখনও পাই। দুপুরে পোলাও খেলেও রাতে বাসায় সবাই ভাতই খায়।  কিন্তু আমি যতদিন পোলাও থাকে ততদিনই সেটা খেতে থাকি। পোলাওয়ের প্রতি আমার চরম একটা আকর্ষণ আছে।

এই হল ঈদ নিয়ে আমার অনুভুতি।  সামনে আরও একটা ঈদ আসছে। এবার বাবা একটা শার্ট কিনে আনল, মামা টাকা দিয়েছিল সেটা দিয়ে একটা পাঞ্জাবি কিনলাম। শার্টটা আগেই পড়েছি, পাঞ্জাবিটাও আজকে পড়ে ফেললাম। অপেক্ষায় আছি ঈদের দিনে পোলাও খাবার। গত ঈদে চারবন্ধু রাত বারটা পর্যন্ত বৃষ্টিতে ভিজে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছিলাম, ভাল লেগেছিল!  এবার যদি অন্যদের সময় ও বৃষ্টি দুটো মেলে তবে হয়ত আবার ভেজা হতে পারে।

এইতো আমার ঈদের আনন্দ। আর কিছু বলার পেলাম না। ঈদের মত একটা উৎসব উপলক্ষে এমন বোরিং একটা পোস্ট দিতে আমারো খারাপ লাগছে, তাই সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থি।

Read Full Post »

যে কোন ভাষার খুব সম্ভবত কবিতাগুলোই তার প্রাণ, ঠিক যেমন আমাদের বাংলা ভাষায়। এই প্রাণের ছোঁয়া থেকে বহুদিন দূরে ছিলাম, এখনো কতটা কাছে এসেছি জানি না। আজকের এই পোস্ট আমার কবিতা পড়ার উপর।
আমার কবিতা পাঠ শুরু সেই ছোট্ট বেলা থেকে। তখন যা পড়তাম তাকে হয়ত কবিতা বলা হয় না, বলে ছড়া। আজকালের বাচ্চারা এগুলোকে বাংলা রাইমস্‌ নামে চেনে। এরপর শুরু হয় স্কুল পর্যায়, সেই সাথে পাঠ্য বইয়ের কবিতা। সেগুলো পড়তাম শুধু পরীক্ষায় নম্বর তুলতে। আমার মনে পড়ে না স্কুলের কোন কবিতা পড়ে আমি মজা পেয়েছি বা বুঝেছি। কবিতার বই বা পেপারে ছাপা বাচ্চাদের কবিতা আমি কখনই পড়তাম না। তখন অবশ্য পেপারও পড়া হত না। ক্লাস এইট থেকে খুব পেপার পড়া শুরু করি। পেপারে সাহিত্যের পাতা দেখতাম কবিতা ভরা।  কবিতা বলতে আমি বুঝতাম, “সাধারণ কথা ছন্দে ছন্দে বলা”।  ছন্দ ছাড়া কতগুলো লাইন কি করে কবিতা হয় তা আমার মাথায় ধরত না। তাই আগ্রহও পাই নাই, আর পড়িও নাই।

খুব সম্ভবত ক্লাস সিক্স-সেভেনের পরে পরীক্ষায় আর কবিতা মুখস্ত লিখতে হত না, শুধু বড়, ছোট প্রশ্ন ও ব্যাখ্যা লিখতে হত। গাইড বই থেকে খুব কষ্ট করে সেগুলো মুখস্ত করে পরীক্ষার খাতায় বমি করার বৃথা চেষ্টা করতাম এবং ব্যর্থ হতাম বার বার। ক্লাস টেন-এ বুঝলাম ৫০ টা অবজেকটিভ ঠিক উত্তর দেবার জন্য বইপড়াটা জরুরি। তখন আবার কবিতা পড়া শুরু, প্রতি কবিতার পেছনের মর্মার্থটুকুও পড়তাম। তবে আমার কাছে একমাত্র নজরুলের ওমর ফারুক কবিতা ছাড়া আর কোনটাই ভাল লাগে নাই। প্রথমত, ঐ কবিতায় ছন্দ ছিল, দ্বিতীয়ত ছন্দে ছন্দে মূলত খলিফা ওমরের (রাঃ) কিছু কাহিনী ছিল যা আমার জানা। অতএব, কবিতা বলতে আমি যা বুঝতাম সেটা ওমর ফারুক কবিতার ক্ষেত্রে ভালই মিলে যায়। ছন্দে ছন্দে কাহিনীর বর্ণনা। বিনা বাক্য ব্যয়ে স্বীকার করব, এসএসসিতে আমি কোন কবিতাই বিন্দু মাত্র বুঝি নাই ঐ একটা ছাড়া।  কলেজের সিলেবাসে যেই কয়েকটা কবিতা ছিল তার মাঝে সাজেশন ভিত্তিক কয়েকটা পড়েছিলাম। রবীন্দ্রনাথে “সোনার তরী” কবিতার মর্মার্থ ভালই লেগেছিল। তবে, আমি এটা ভেবে পেলাম না ঐ কথা গুলো সরাসরি একটা ছোট্ট প্রবন্ধে লিখলেই তো হত। আবজাব রূপক এনে এত প্যাচানোর কি ছিল! এসএসসিএর পরে কবিতা হতে মুক্তি লাভ হয় এবং কবিতা জীবনে আর কখনই আমার পড়তে হবে না তা নিশ্চিত হয়ে যাই।
সেই সাথে কবিদেরও আমার কাছে খুব হাস্যকর এক প্রাণী মনে হত বরাবরই। যারা একটা অপ্রয়োজনীয় কাজ করে যাচ্ছে আর নিজেদের স্পেশ্যাল ভাবছে। কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পন হলেও কবি ও তার কবিতা উভয়ই আমার কাছে তাচ্ছিল্যের বিষয় ছিল। আমাদের এক সহপাঠিনী ও আমারই খুবই ভাল বান্ধবি কবিতা লিখে এবং আবৃত্তিও করে। ছন্দহীন কবিতার ন্যাকা ন্যাকা ভাবে আবৃত্তি খুব সহজ একটা জিনিস আমার মেজাজ খারপ করা ও মাথা ব্যাথা শুরু করাবার জন্য। আমার ধারনা ছিল আজকালের যে কোন প্যারাগ্রাফকেই কয়েকটা লাইনে ভেঙে, ঐ ন্যাকা আবেগে আবৃত্তি করলেই তা কবিতা হয়ে যায়। আমরা দুই একজন বন্ধু মাঝে মাঝে সংবাদপত্রের নিখোঁজ সংবাদ, খুনের কাহিনী, রাজনৈতিক পবন্ধ এমনকি টেলিভিষনের পোগ্রামসূচী ইত্যাদিকে আবৃত্তির ঢং-এ পড়তাম এবং প্রমান করতাম আজকাল কবিতা লেখা আর বিশেষ কোন গুন নয়।

এভাবে চলতে চলতে একদিন আমার অভ্র দিয়ে বাংলা টাইপিং-এর সাথে পরিচয়। প্রথম প্রথম খুব মজা পেতাম। একরাতে এক বান্ধবির সাথে কথা হচ্ছিল মেসেঞ্জারে, তার জন্য কিছু একটা গুগলে খুজতে খুজতে এসে পড়লাম এই সামহোয়্যারে। আগ্রহ বসত পড়ে ফেললাম, বিহংগদার একটা কবিতা “[link|http://www.somewhereinblog.net/blog/pordeshi07blog/28731433|প্রিয় গড যদি কিছু মনে না করেন]”। ভাল লাগল, ছন্দ তেমন ছিল না কিন্তু অর্থ বুঝতে পারলাম খুব সহজে। বান্ধবিকেও দিলাম, তার ভালও লাগল। এভাবেই একসময় এই ব্লগে থিতু হয়ে বসল “বিবর্তনবাদী”(যদিও আমার ব্লগে আগমনের কাহিনী আরো ব্যাপক এবং তা পরে একদিন লেখা হবে)। পানিতে ডুব দিলে যেমন পানি কিছুটা হলেও গিলতে হয়, তেমনি ব্লগে ঘোরাঘুরি করতে করতে কবিতাও কিছু পড়া হয়। বেশিরভাগ ছন্দহীন এসব কবিতা কখনই ভাল লাগত না। তবুও কিছু প্রিয় ব্লগারের কবিতার পোস্টে প্রায়ই না বুঝেই “ভাল হয়েছে”, “প্লাস”, “দারুন”, “চলুক” জাতীয় কমেন্ট ফেলে আসতাম। এসব ফাঁকা কমেন্টস করতে কখনই ভাল লাগত না। একদিন ঠিক করলাম এখন থেকে কবিতা গুলো পড়েই কমেন্ট করব। এক লাইনও যদি বোঝা সম্ভব হয় তবে সেই লাইনটাই তুলে দিয়ে সাথে গতানুগতিক কমেন্ট জুড়ে দেব। সেই শুরু।

যতদূর মনে পড়ে আমার প্রথম উপলব্ধি করে পড়া কবিতা সাজি আপুর লেখা। ওনার [link|http://www.somewhereinblog.net/blog/sultanashirinshaziblog/28776190|মেয়েটার স্বাধীনতা] ও [link|http://www.somewhereinblog.net/blog/sultanashirinshaziblog/28813107|শো-কেসে সভ্যতা] কবিতা দুটি সব সময় মনে থাকবে। প্রথম প্রথম নিবেদীতা, নাদান, মুকুল ভাই, কালপুরুষসহ কয়েকজনের কবিতা ভাল লাগত। পরে পড়ি চিটি (হামিদা আকতার), ভাঙা-চাঁদ,  খোলাচিঠির কবিতা। এখন আমাদের কবি আব্দুলও ভাল কবিতা দিচ্ছেন। নাদানের একটা কবিতা পড়ে নিজের কাছে খুব খারাপ লাগছিল যে আমি কবিতা লিখতে পারি না। নাদান ভাইয়ের কবিতার কমেন্টেও তা বললাম। উনি বললেন, লিখা শুরু করেন হয়ে যাবে। সেই দিনই বা তার পরের দিন রাতে উত্তরা থেকে ফার্মগেইটের দিকে যাচ্ছিলাম। ঠিক সামনের সিটে একটা মেয়ে এসে বসল, যার নাকটা খুব ভাল লাগল। বাস যাত্রা শেষে ঘরে ফিরে ঠিক করলাম ঐ মেয়ের সুন্দর নাকটাকেই স্মৃতিতে সতেজ রাখব তাকে নিয়ে [link|http://www.somewhereinblog.net/blog/onujibblog/28750558|কবিতা লিখে]। সেই প্রথম কবিতা লেখা, যা আমার কাছে এককালে অকল্পনীয় ছিল। যদিও এরপর কাব্য চর্চা আর বেশি দূর এগোয় নি, কিন্তু আমার কবিতা না পড়ার অভ্যাসটা গেছে। এখন কবিতা পড়ি, ভালই লাগে। তবে হ্যা, সেটা বল্গের বাইরে বেশি দূর এগোয় নি। কিছু দিন আগে বন্ধুরা কবিতা বিষয়ক আলোচনা করছিল, আমিও সেখানে যোগ দিলাম। লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়েই ওদের বলতে হল, “Actually, কবিতা is not a bad thing”। আমার দ্বারা অতীতে নির্যাতিত কবিরা খানিক্ষণ স্তব্ধ হয়ে গেছিলেন। পরে তারা কমেন্ট করলেন, “নিশ্চয়ই নতুন করে প্রেমে পড়েছি”। এখানে একটা কথা উল্লেখ করতে হয়, আমার প্রিয়াকে প্রেম নিবেদনের কিছুদিন পরেই জানিয়ে দিয়েছিলাম তার জন্য আর যাই করি না কেন কবিতা লেখা সম্ভব না। বিধায় চার বছর পরে “Actually, কবিতা is not a bad thing” উচ্চারণ করা আমার জন্য বিপদের কারনই হতে পারত। যদিও তেমন কিছু হয়নি। আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, বর্তমানে আমার প্রিয় কবিকে? উত্তর হবে, সুলতানা শিরীন সাজি, বিহংগ, কালপুরুষ। যদিও এদের ব্লগ জগতের বাইরে কেউ চিনে না, তবুও আমি দুই একজনকে এমনি উত্তর দিয়েছি।

এবার আসি বিখ্যাত কবিদের কথা। রবীন্দ্রনাথের “শেষের কবিতা” উপন্যাস পড়েছিলাম, কিন্তু তার কবিতা গুলো বাদে। ব্লগে আসবার পরে সেই বই আবার হাতে নিতে হয়ে ছিল এবং কবিতা পড়াও হয়েছিল। নজরুলের প্রেম বিষয়ক একটা বইতে “বর্ষা বিদায়” কবিতাটি এর রচনার পেছনের ঘটনা সহ উল্লেখ থাকায় পড়ে বুঝতে কোন সমস্যা হয় নাই। খুব ভালও লাগল। ঢাবিতে আমাদের এক অধ্যাপক জসীমুদ্দিনের “কবর” কবিতাটাকে জীববিজ্ঞানের সাথে মিলিয়ে মজা করে তুলে ধরেছিলেন। সেটাও ভালই লাগে।

এই আমার কাব্য চর্চার দৌড়। ভবিষ্যতে আরো চলবার আগ্রহ আছে। ব্লগেই প্রচুর কবিতা পাব পড়ার জন্য।  আরো বিশ্বাস আছে নিজে যাই লিখি না কেন, কোন না কোন ব্লগ বন্ধু “ভাল হয়েছে”, “প্লাস”, “দারুন” বা “চলুক” জাতীয় মন্তব্য আমার দিকে ছুড়েই দেবেন। সেটাই হবে আমার কাব্যচর্চা এগিয়ে নেবার জ্বালানী।

তবে হ্যাঁ, কবিকুলের কাছে আমার একটা প্রার্থণা, অতীতের দৃষ্টিভঙ্গির জন্য ক্ষমা করবেন। এখন আমি বিশ্বাস করি, কবিতায় অল্প পরিসরে এমন সব ভাব প্রকাশ সম্ভব যা হাজার পাতার উপন্যাসেও হয়ত সম্ভব নয়।  আপনারাও স্বীকার করবেন, বিবর্তনবাদীর খানিকটা বিবর্তনতো অবশ্যই ঘটেছে।

Read Full Post »

ফলাফলে গড়মিল

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে যাদের রেজাল্ট ভাল হয় না তারা খুব একটা পাত্তা দেয় না। স্কুল জামানায় পরীক্ষার রেজাল্ট পোলাপানের জন্য একটা আলাদা ফিলিংসের ব্যাপার তা সে খারাপ হো আর ভাল ছাত্রই হোক না কেন। পরীক্ষার রেজাল্টের পরে অনেকেরই আশা ভঙ্গ হয়। কেউ হয়ত অনেক খারাপ নম্বর পাওয়া ভয়ে থাকে, কিন্তু বেশি পেয়ে যায়। আবার খুব ভাল রেজাল্টের আশা করে অনেকেই ধরা খায়। এই ঘটনাগুলো ছাড়াও আর একটা ব্যাপার ঘটে কারো কারো সাথে, তা হল যত নম্বরের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে তার চাইতে বেশি নম্বর পাওয়া। এমন হবার পেছনের কিছু কাহিনী থাকে, যা সেই সময়ে অনেকেই জানে না, পরে খোলাসাও হয় না। আমি এমন কিছু ঘটনার সাক্ষি, ব্লগের আদালতে সাক্ষি দিতে এলাম। ব্লগ জনতা বিচার করুক।

আমি এসএসসি দিলাম ১৯৯৯-এ। পরীক্ষার পরে রিলাস্ক মুডে আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি বাড়ি ঘুরাঘুরি করছিলাম। একদিন বাবা ফোনে করে বলে স্কুলের আহসান স্যার (আসল নাম বললাম না) আমার বন্ধুদের দিয়ে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছে, খুব জরুরী। ঘোরাঘুরি ফেলে আমি বাসায় চলে এলাম। এসেই দেখি ক্লাসের ফার্স্টবয় আমির বাসায় বসে আছে। স্যার ওকে বলেছে, আমাকে নিয়ে সরাসরি স্যারের বাসায় চলে যেতে। এত মাতামাতি দেখে খানিকটা চিন্তিতই হলাম, ঘটনা কি। স্যারের কাছে আমি, আমির সেই ক্লাস এইট থেকে পড়ি। স্যার যেমন আমাদের পছন্দ করতেন ঠিক আমরাও স্যারে চেলা ছিলাম। উনি পদার্থবিজ্ঞান আর রসায়ন অসাধারণ বোঝাতেন। আমার স্বীকার করতেই হবে, উনার মত বিজ্ঞানের শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটাও পাই নাই। এসএসসি পরীক্ষার স্যার প্রতিদিন আমাদের বাসায় সেই দূর থেকে হেটে এসে আমার খবর নিয়ে যেতেন। একটা সময় আমি আমার বাবা-মায়ের উপর এক ধরণের বোঝা ছিলাম, আজকে আমি যেই অবস্থায় আছি তা শুধু স্যারের অবদান। স্যারকে নিয়ে আলাদা পোস্ট দিব একদিন।

যা বলছিলাম, তা আমি আর আমির গেলাম স্যারের বাসায়। গিয়ে দেখি আরো দুই বন্ধু বসে আছে। স্যার বলে, “তোরা ফ্রি আছিস তো? আমার একটা কাজ করে দিতে হবে”। স্যারের মুখের কথাই আমাদের জন্য হুকুম, উত্তর দিলাম “ইয়েস স্যার, আমরা ফ্রি”। স্যার তার টেবিলের নিচ থেকে কয়েক বান্ডিল খাতা বের করে দিলেন। এসএসসির পদার্থ বিজ্ঞান খাতা ও ক্লাস টেনের অংক খাতা। আমার আর আমিরের কাজ হচ্ছে এই খাতা গুলো দেখা, আর বাকি দুজনের কাজ নাম্বার যোগ করে লিস্টে উঠানো। আমাকে দিল এসএসসির পদার্থ বিজ্ঞান, আর আমিরকে দিল ক্লাস টেনের অংক।

কাজটা ঠিক না ভুল সেটা বিবেচনা করার মনমানসিকতা আমাদের তখনও হয়নি। আমি সেই বার এসএসসি দিয়েছি, আর স্যার আমাকে দিয়েই এসএসসির খাতা কাটাচ্ছে এতে গর্বে বুক ফুলে উঠেছিল। মনের আনন্দে শুরু করলাম। প্রতি বান্ডিলে ৫০ টা করে খাতা থাকে। দেখা যায় এক বান্ডিলে নম্বর বিশের (চল্লিশে পরীক্ষা) উপরেই উঠে না তো অন্য বান্ডিলে ৩৫ এর নিচে নামে না। এটা খুব সম্ভবত ভাল স্কুল খারাপ স্কুলের প্রভাব। যেই খাতা গুলোতে ১২/১৩/১৪ উঠত স্যারে নির্দেশ ছিল সেগুলোকে যে ভাবেই হোক ১৫ (পাশ নম্বর) করতে হবে। নইলে সেই খাতা হেড এক্সামিনার চেক করবে। আবার যেগুলোতে ৩৭/৩৮ এর উপরে উঠবে সেগুলা আবার দেখতে হবে নইলে সেগুলোও হেড এক্সামিনার দেখতে পারে। আমরা তাই করতাম। হয়ত অনেকে ১০ নম্বর এর উত্তর দিয়েছে। নিজেরাই অংক করে তারে ১৫ দিয়ে দিতাম। আবার খুব বেশি পাওয়া খাতাগুলোতে নম্বর কমাতাম না, মাথায় ঘুরত হয়ত কোথাও কেউ আমার খাতাও এভাবেই দেখছে। আমি কম দিলে না আবার আমার উপর গজব নামে। এটাই ছিল ভেতরের ঘটনা, যে ১০ এর উত্তর দিয়েছে সে হয়ত নিজেকে নিশ্চিত ফেল ধরে বসে আছে। কিন্তু রেজাল্টে দেখবে সে পাশ।

তাছাড়া আরো কিছু রহস্যের উদ্ঘাটন হল। স্কুলে প্রিটেস্টের অংক পরীক্ষায় দেখি আমার একটা অংক কাটা, একটা জায়গায় লাল কালিতে গোল করা। আহসান স্যার খাতা দেখেছিলেন, আমি স্যারে কাছে প্রশ্ন করলাম স্যার আমার উত্তর তো ঠিক আছে আর লাল গোল দেওয়া অংশতেও কোন ভুল নাই। স্যার কিছুক্ষণ খাতাটা দেখলেন, তারপর অন্য একটা ভুল দেখিয়ে বললেন এই কারনে নম্বর দেই নাই। আমার কাছে ব্যাপারটা সন্দেহজনক লাগে, স্যার নিজে দেখে থাকলে নিশ্চয়ই অন্য ভুলটা ধরতেন, অহেতুক সঠিক অংশে কেন দাগ দেবেন। এসএসসির খাতা কাটতে গিয়ে বুঝলাম পেছনের ঘটনা।

কলেজ জীবনে টিচারদের সাথে তেমন মেলামেশা হয় নি। অনেকটা মুক্ত ছিলাম, উপভোগ করেছি মুক্ত জীবনের আনন্দ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আবার সিরিয়াস হলাম। এখানেও অনেকটা একই ঘটনার সম্মুক্ষিণ হই। খুব সম্ভবত সেকেন্ড ইয়ারে আমাদের ক্লাসের কয়েকজন গেল এক স্যারের কাছে মিডটার্মের নাম্বার আনতে। স্যার ওকে একটা সাদা কাগজ ধরিয়ে বললেন, “লেখ”। সে এক একটা খাতা হাতে নিয়ে পৃষ্টা উল্টিয়ে পালটিয়ে নাম্বার বলতে লাগলেন। বেশি হলে ১০ মিনিটে ২৫টা খাতার নম্বর দিয়ে দিলেন। আমরা অনেকেই পরীক্ষাটা খুব ভাল দিয়েছিলাম, দশে দশ পাব ধারনা ছিল কিন্তু পেলাম ৫/৬/৭ এরকম। আর এক সহপাঠী খুব খারাপ পরীক্ষা দিয়েও পেল ৯। পার্থক্য একটা তার হাতের লেখা ভাল ও খাতা পরিস্কার ছিল (তেমন কিছু লেখে নাই)। উক্ত শিক্ষক এখন এক স্বনামধন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য!

সেশন জটের ফ্যাসাদে আমি এখনও মাস্টার্সের গন্ডি পেরুতে পারলাম না। শংকা ছিল হয়ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাবে, সেইরকমই শুনছিলাম। শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে, ঢাবি এখনও চলছে। ফলে চলছে আমার পরীক্ষাও। চারটা পরীক্ষা ঈদের আগে বাকি চারটা ঈদের পর। ঈদের আগের তিনটা পরীক্ষা হয়েছে, একটা বাকি। আমি নিশ্চিন্তে ব্লগিং করে যাচ্ছি। চার নম্বর পরীক্ষাটা নিয়ে চিন্তা নাই, কারন খেটে লাভ নাই। বাংলাদেশে একজন স্বনামধন্য বিজ্ঞানীর বিষয় সেটা। দেশে জ্ঞানিগুনিজনের নাম উঠলে স্যারের নাম আসবেই। উনিও পরীক্ষার ব্যাপারে কেয়ারলেস। না দেখে নম্বর দেন। আমরাও রিলাক্স থাকি।

তবে এসএসসির ব্যাপারে কিছু বলতে চাই। অনেক শিক্ষকই মূলত এসএসসির সব খাতা দেখেনই না, দেখলেও ভাল করে দেখেন না। প্রতি বান্ডিলের চার/পাঁচটা খাতা দেখে আন্দাজ করে বাকি গুলায় নাম্বার দেন। পরীক্ষার খাতা হাতে পাওয়ার আগে হেড এক্সামিনারদের একটা ওয়ার্কশপে নানা নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেখানে ঠিক করা হয় নম্বর কেমন দেওয়া হবে। যেমন ধরুন, বাংলার হেড এক্সামিনারদের যদি বলা হল নম্বর বেশি দিতে। তারা আগে হয়ত যেই রচনা খুব ভাল লিখতে বিশে ১৫/১৬ দিতেন সেখানে হয়ত একেবারে বিশই দিয়ে ফেলেন। এটাই এখনকার অতিরিক্ত এ+ এর নেপত্থের একটা কাহিনী। আর একটা ব্যাপার হল টিচারদের খাতা দেখতে দেওয়ার সময় এক ধরণের উত্তরপত্র দেওয়া হয়। এতে থাকে কোন প্রশ্নের উত্তরে কতটুকু বা কি কি লিখলে কেমন নম্বর দিতে হবে। যদি লেখা থাকে কোন রকম উত্তর দিলেই ফুল মার্কস দিতে হবে, তখনই এ+ -এ দেশ ভেসে যায়। নেপত্থের ঘটনা হল এরকম, শিক্ষার মানের সাথে এর কোন সম্পর্ক নাই।

Read Full Post »

~অবশেষে~

পাখিরা চায় আকাশের নীল
কবিরা চায় ছন্দের মিল
আর আমি শুধু চাই তোমাকে-
গানটা শুনি আর ভাবি, তুমি কে?

তুমি কি রূপকথার ডানাকাটা পরী,
নাকি স্বর্গের হুর?
তুমি কি বৃষ্টির পর রোদ ঝলমলে দুপুর,
নাকি সকাল বেলার নীল আকাশের চাঁদ?
তুমি কি ভাসাবে আমায় তোমার চোখের জলে,
নাকি নাঁচব মোরা রবিদার গানের আবেশে?

তখনই মনটা খারাপ হয়ে যায়-
কারন

ডানাহীন তোমার বেরুতে হবের রূপকথার গল্প হতে!
যদি হও স্বর্গের হুর তবে পাবনা মর্তলোকে!
যদি হও বৃষ্টির পর রোদ ঝলমলে দুপুর,
তার আগে  ঢাকবে তুমি মেঘে তোমার মুখ!
যদি হও সকাল বেলার নীল আকাশের চাঁদ,
তখন থাকবে না যে সারাটা দিন আর!
যদি ভাসাও আমায় তোমার চোখের জলে
সইবে না যে মনটা আমার তাতে!

তাইতো আমি তোমায় নিয়ে আর মাতি না
রবিদার গানও যে আর শুনি না।
পাখি উড়ে আকাশে,
কবি ডোবে ছন্দে,
আর আমি পাই তোমাকে,
পরীক্ষার রেজাল্টে, অথবা
মাস শেষে বেতনে।।

বিবর্তনবাদী
সময়: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৮ ভোর পাঁচটা
স্থান: ঢাকা

Read Full Post »

Older Posts »